রোযা ফরজ করার হেকমত কি?

রোযা ফরজ করার হেকমত কি?

মহান  আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র রমজান মাসে সিয়াম সাধনা করা ফরজ করে দিয়েছেন। যেমন : পবিত্র কোরানের বাণী :

يَاَيُّهَا الَّذِيْنَ اَمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الِّذِيْنَ مِنْقَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হল, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ‍উপর ফরজ করা হয়েছেল, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা বাকারা : ১৮৫)

পবিত্র কোরআনে ‘তাক্বওয়া’ শব্দটি তিনটি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম অর্থ – ভীতি; দ্বিতীয় অর্থ – আনুগত্য আর তৃতীয় অর্থ : পাপ মোচন। এ তিনটি অর্থ একত্র করলে তাক্বওয়ার অর্থ হয় মহান আল্লাহ পাকের প্রতি ভয় রেখে তার প্রতি পূর্ণ আনুগত্যশীল হওয়া এবং যাবতীয় পাপ বর্জন করা। তাক্বওয়া অর্জন করলে মুত্তাকী বলা হয়।

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ

“যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে সে যেন অবশ্যই এ মাসের রোযা পালন করে। (সূরা বাকারা : ১৮৫)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র রমজান মাসের রোযা ফরজ করার হেকমত নিম্নে আলোচনা করা হল :

(১) তাক্বওয়া বা খোদাভীতির প্রশিক্ষণের মাস রমজান মাস: যেমন : لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ  “যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।”

(২) আত্মশুদ্ধির ও আত্ম গঠনের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা।

(৩) রোযা শয়তানের হামলা প্রতিহত করতে বিরাট ঢালস্বরূপ। যা বান্দাকে পাপ কাজ থেকে নিবৃত্ত রাখে। যেমন : রাসূল (সাঃ)  এরশাদ করেন :

قَالَ النَّبِىُّ صلعم اَلصِّيَامُ جُنَّةٌ مَا لَمْ يَخْرِقْ

(৪) রোযার মাধ্যমে ধৈর্য্য সহিষ্ঞুতা ও বিনম্র স্বভার গঠন করা যায়।

(৫) মানুষের মধ্যে নেয়ামতের শুকরিয়ার চেতনা সৃষ্টি হয়।

(৬) সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাসে ক্ষুধায় যন্ত্রণা উপভোগের মাধ্যমে রোযাদারকে দরদী সংবেদনশীল ও সহমর্মী বানায়।

(৭) যেহেতু রমযান হচ্ছে কোরআন নাজিলের মাস  সেহেতু সিয়াম পালনের মাধ্যমে কোরআনের আলোকে সমাজ গঠনের প্রেরণা সৃষ্টি হয়।

(৮) সিয়াম সাধনা বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমজের সাম্য, মৈত্রী, ভ্রতৃত্ব ও ভালোবাসার জন্ম দেয়।

(৯) রমাজানের রোযা বান্দার অতীত জীবনের সমস্ত পাপ মোচনের অন্যতম পন্থা বা উপায়। যেমন : হাদীস শরীফে এসেছে :

عَـنْ اَبـِىُ هُرَيْـرَةَ ­(رضى) قَـالَ قَـالَ رَسُـوْلُ اللهِ صلعـم مَـنْ صَامَ رَمَـضَانَ اِيْـمَـانًا وَّ اِحْـتـِسَـابًا غُـفِـرَ لَـهُ مَا تَـقَـدَّمَ مِـنْ ذَنّْـبِـه ِوَمَا تَاَخَّـرَ

বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেন, যে লোক রমজান মাসের রোযা রাখবে ঈমান ও চেতনা সহকারে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। (বুখারী ও মুসলিম)

(১০) রোযার মাধ্যমে বান্দাহর জন্য রহমতের ব্যবস্থা হয়। যেমন : রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেন :

اِذَا جَاءَ رَمَـضَـانَ فُـتِـحَـتْ اَبْـوَابَ الرَّحْـمَةِ

রমযান যখন আসে তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর রহমতের দরজা খুলে দেন। (বুখারী ও মুসলিম)

(১১) রোযা মানবতার চরিত্র বিধ্বংসী কুপ্রবৃত্তিকে প্রশমিত করে।

(১২) রোযার উপবাসের দ্বারা ধনীরা যাতে বুঝতে পারে গরিবদের অনাহার ও কষ্টের কথা, যার দরুন গরিবদের দান সদকা করতে আগ্রহ সৃষ্টি হয়।

 

মুনাফা নির্ভর ব্যাংক কি সুদ নির্ভর ব্যাংকের চেয়ে বেশী সংকটের সম্মুখীন হবে?

প্রশ্ন : মুনাফা নির্ভর ব্যাংক কি সুদ নির্ভর ব্যাংকের চেয়ে বেশী সংকটের সম্মুখীন হবে? অর্খাৎ, অনেকেই অভিযোগ উত্থাপন করে থাকেন যে, ব্যবসায় ও শিল্প উদ্যোগে সরাসরি অংশ গ্রহণের কারণে মুনাফা নির্ভর ব্যাংক সমুহ অনেক বেশী সংকটের বা সমস্যার সম্মুখীন হবে। ব্যাংকগুলো নিজেরাই বাণিজ্য চক্রের শিকার হয়ে পড়বে। যার পরিণামে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চতার ঝুকি আরও বৃদ্ধি পাবে।

উত্তর: বাস্তব অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রকৃত অবস্থা ও ঘটনা সমূহের যথাযথ পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করলে উপরোক্ত প্রশ্নের বিপরীত সত্যই দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। প্রকৃত পক্ষে সুদনির্ভর ব্যাংকসমূহই অর্থনীতিতে মন্দা প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করে খাকে এবং একবার অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে সেই অবস্থা হতে উত্তরণের পথেও যথেষ্ট অন্তরায় সৃষ্টি করে সুদ নির্ভর ব্যাংক গুলোই। এই ব্যাংকগুলো সাধারণ নীতি হিসাবেই যে কোন সময়ে প্রদত্ত রিণ ফেরত নেওয়ার অধিকার সংরক্ষিত  রাখে। তাই স্বাভাবিক ভাবে যখনই কোন সংকটের পূর্বাভাষ পাওয়া যায় তখনই ব্যাংকগুলো তাদের প্রদত্ত   রিণ ফেরত চেয়ে বসে। এভাবে যে সময়ে সংকট কাটিয়ে উঠবার জন্যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গুলোর আরো বেশি সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন ঠিক সেই সময়েই সহায়তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে সংকট আরও দ্রুত বেগে ধেয়ে আসে, আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে দাঁড়ায়।

প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংক সমুহের এই সুবিধাবাদী নীতি বাণিজ্য চক্রের নিম্নমুখী গতিকে তাই দ্রুততর করে তোলে। অপর দিকে মন্দা কালীন সময়ে সুদভিত্তিক রিণ যখন অনাদায়ী থেকে যায় তখনও কিন্তু তার উপর যথারীতি পূর্ব নির্ধারিত হারেই সুদ যােগ হতে খাকে এবং ক্রমে ক্রমে এটি একটি বিপুল বোঝা হয়ে দাড়ায়। অর্থনৈতিক মন্দার মৌলিক কারণগুলো দুরীভূত হয়ে গেলেও পুঞ্জভূত সুদের এই বোঝা উদ্যোক্তা বা রিণগ্রহীতার কাছে দূর্বহ বলে মনে হয়। এই রিন আদায়ে তখন সঙ্গত কারণেই বিলম্ব হয়ে যায়। কখনও কখনও এইসব প্রতিষ্ঠান শেষ  অবধি নিঃস্ব দেওলিয়া হয়ে দাড়ায়, ধংস হয়ে যায় সমুলে।

পক্ষান্তরে ব্যবসায় বা শিল্প উদ্যোগে মুনাফার নির্ভর ব্যাংক তথা ইসলামী ব্যংক তার বিনিয়োগকৃত অর্থ সহসাই প্রর্তাহার করে নিতে পারে না উপরন্তু এই ব্যাংক পদ্ধতিতে উদ্যোক্তার উপর রিণের জন্যে বাড়তি কোন বোঝা তো চাপানো হয়ই না, বরং ব্যবসায়ে উদ্ভুত প্রকৃত লোকসানেরও অংশ বহন করা হয়ে থাকে। এভাবেই মুনাফা নির্ভর ব্যাংক মন্দার কুফলের প্রভাব লাঘব করার প্রয়াস পেয়ে থাকে।

এছাড়া বর্তমান সময়ে ১৯৩০ এর দশকের মতো ভয়াবহ মহামন্দার পূণরাবির্ভাবের সম্ভাবনা খুবই কম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে অবশ্য কয়েকবার বড় আকারের ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। তবে সেগুলো ধরণ-ধারণের দিক থেকে মহামন্দার শ্রেনীর নয়। এগুলো ছিল বিশেষ কোন খাতের মুদ্রস্ফীতি, ঘাটতি অথবা Stagflation. মুনাফা নির্ভর ব্যাংক সমুহ এই জাতীয় মিশ্র প্রভাবের দ্বারা মারাত্মক ভাবে ক্ষতি গ্রস্ত হবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম। একই কারণে এই ব্যাংকের বাণিজ্য চক্রের শিকার হওয়ার সম্ভাবনাও স্বল্প।

সুদ নির্ভর ব্যাংকিং সমাজে কি ইসলামী ব্যাংক টিকে থাকতে পারে ?

প্রশ্ন :সুদ নির্ভর ব্যাংকিং সমাজে কি ইসলামী ব্যাংক টিকে থাকতে পারে ? অর্থাৎ,যেখানে সমগ্র জাতীয় ব্যাংকিং কাঠামোই সুদ নির্ভর সেখানে ইসলামী ব্যাংক আদৌ টিকে থাকতে সমর্থ  হবে না।

উত্তর : একথা অবশ্য খুবই সত্য যে, সার্বিক পদ্ধতি হিসাবে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করলে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম ক্ষমতা ও কর্মতৎপরতা বহুগুণে জোরদার হবে। সঞ্জীবনী শক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। উপরন্তু জাতীয় ব্যবস্থা হিসাবে একে গ্রহণ করতে পারলে সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় ইসলামী ব্যাংক তার পূর্ণ প্রভাব বিস্তার ও সহযোগিতা দানেও সক্ষম হবে। কিন্তু তাই বলে সুদ নির্ভর জাতীয় ব্যাংক পদ্ধতির মধ্যে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা ও যোগ্যতার সাথে টিকে থাকা অসম্ভব কিছুই নয়। অন্তত ঐতিহাসিক ভাবে এ সত্য আজ প্রমাণিত। পৃথিবীর পনেরোটি দেশে সুদ ভিত্তিক ব্যাংকের পাশাপাশি ত্রিশটিরও বেশী ইসলামী ব্যাংক কাজ করে চলেছে। সেসব ব্যাংক শুধু যে টিকে আছে তাই নয়, তারা উত্তরোত্তর অধিকতর মুনাফা অর্জন করে সুদ নির্ভর ব্যাংক গুলোর সাথে তীর প্রতিযোগিতা করে চলেছে। এইসব ব্যাংকের সামর্থ , কার্যকরী ক্ষমতা , সঞ্জীবনী শক্তি প্রভৃিতি আজ প্রশ্নাতীত প্রসঙ্গ।  দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যেটি অবশ্যই সুদ নির্ভর সাথেও ইসলামী ব্যাংকগুলো সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছে।

ইসলামে সরল ও নিম্ন হারের সুদ গ্রহণ ও প্রদানে বাধা কোথায় ?

প্রশ্ন : ইসলামে সরল ও নিম্ন হারের সুদ গ্রহণ ও প্রদানে বাধা কোথায় ? অর্থাৎ কেউ কেউ মনে করে থাকেন যে, ইসলামে শুধুমাত্র চক্রবৃদ্ধি বা উচ্চহারের সুদকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরল ও নিম্ন হারের সুদের ব্যাপারে ইসলামের নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়। তারা আরও মনে করে থাকেন ইসলামে চক্রবৃদ্ধি বা উচ্চহারের সুদকেই যা খুব অল্প সময়ের মধ্যে মূলধনকে দ্বিগূণ, তিনগূণ করে দেয়, শুধু মাত্র তাকেই ঘৃণার চোখে  দেখা হয়েছে। তাদের যুক্তির সপক্ষে তারা আল-কুরআনের এই আয়াতটির উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন।

“হে ঈমানদারগণ! এই চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খাওয়া পরিত্যাগ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর। আশা করা যায় যে তোমরা কল্যাণ লাভ করবে।”      (সুরা- আলে ইমরান : ১৩০)

উত্তর : উপরে বর্ণিত যুক্তিটি ভুল ভিত্তির উপরেই পেশ করা হয়েছে। একারণেই এটি সঠিক নয়। সমস্ত মুসলিম ফকীহই এ বিষয়ে সম্পুর্ণ একমত যে, ইসলামে কোন প্রকার শর্ত ছাড়াই সুদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূল অর্থের উপর সকল অতিরিক্ত লেনদেনই নিষিদ্ধ করণ আদেশের আওতায় এসেছে। প্রকৃতপক্ষে উপরে উদ্ধৃত আল-কুরআনের আয়াটির ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করার ফলেই এই ভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। আল-কুরআনের কোন আয়াতের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করার সময়ে সমস্ত ফিকাহবিদদেরেই অনুসৃত ও গৃহীত নীতি হলো সার্বিক প্রেক্ষাপটে প্রাসংগিক সকল বিষয়কে সামনে রেখেই তা করতে হবে। বিচ্ছিন্ন ভাবে শুধুমাত্র একটি আয়াতের ব্যাখ্যা করা কখনও সমীচীন নয়। এতে বক্তব্যটির মূল উদ্দেশ্য যেমন ব্যাহত হতে পারে তেমনি অর্থেরও বিকৃতি ঘটতে পারে।

তাই সুদের প্রসঙ্গ নীচে উদ্ধৃত আল-কুরআনের আয়াত সমূহের পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ  করা যুক্তিযুক্ত। এরশাদ হয়েছে —

“কিন্তু যারা সুদ খায় তাদের অবস্তা সেই ব্যক্তির মতো হয়, যাকে শয়তান তার স্পর্শ দ্বারা পাগল ও উদ্ভ্রান্ত করে দিয়েছে। তাদের এরূপ অবস্থা হওয়ার কারণ এই যে, তারা বলে : ব্যবসা তো সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন ও সুদকে হারাম করেছেন। কাজেই ‍যে ব্যক্তির নিকট তার প্রভুর তরফ হতে এই উপদেশ পৌছবে এবং ভবিষ্যতে এই সুদখোরী হতে বিরত থাকবে সে পূর্বে যা কিছু খেয়েছে তা তো খেয়েছেই – সে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ রুপে খোদারই উপর সোপর্দ। আর যারা নির্দেশ পাওয়ার পরও এর পূনরাবৃত্তি করবে তারা নিশ্চিতরুপে জাহান্নামী হবে সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।”

“আল্লাহ সুদকে নির্মূল করে দেন এবং দান খয়রাতকে ক্রমবৃদ্ধি করেন এবং আল্লাহ কোন অকৃতজ্ঞ ও পাপী মানুষকে মাত্রই পছন্দ করেন না।”

“তবে যারা ঈমান আনবে ও নেক কাজ করবে, নামায কায়েম করবে ও যাকাত দিবে তাদের প্রতিফল নিশ্চিত রুপেই তাদের প্রভুর নিকট রয়েছে এবং তাদের জন্যে কোন ভয় ও চিন্তার কারণ নেই।”

“হে ঈমানদারগণ ! আল্লাহকে ভয় কর। আর তোমাদের যে সুদ লোকদের নিকট পাওনা রয়েছে তা ছেড়ে দাও, যদি বাস্তবিকই তোমরা ঈমান এনে থাকো।”

“কিন্তু তোমরা যদি এইরুপ না কর, তবে জেনে রাখ যে আল্লাহ  এবং রসূলের (সঃ) পক্ষ হতে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা রয়েছে। এখনও ‍যদি তওবা কর (এবং সুদ পরিত্যাগ কর) তবে তোমরা মূলধন ফিরিয়ে লওয়ার অধিকারী হবে। না তোমরা যুলুম করবে, না তোমাদের প্রতি যুলুম করা হবে।”

“তোমাদের নিকট হতে ঋণ গ্রহন কারী ব্যক্তি যদি অভাবগ্রস্ত হয় তবে স্বচ্ছল হওয়া পর্যন্ত তাকে অবসর দাও। আর যদি সদকা করে দাও তবে তা তোমাদের পক্ষে অধিকতর কল্যাণকারী হবে, যদি তোমরা বুঝতে পার।”   (সুরা আল-বাকারা : ২৭৫-২৮০)

উপরে উদ্ধৃত আয়াত সমূহে সুদের হার সরল হবে কি চক্রবৃদ্ধি হবে, নীচু হারে হবে অথবা উচু হরে হবে সেসবের কোনও উল্লেখ নেই। তাছাড়া সুদ নিষিদ্ধ করণের ব্যাপারেও কোন রকম শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়নি।

উপরন্তু বাস্তব ও ব্যবহারিক দিক হতে সরল ও চক্রবৃদ্ধি হারের সুদের মধ্যে পার্থক্য বাহ্যিক মাত্র। প্রকৃতই এই দু’য়ের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। উদাহরণ স্বরুপ, সরল সুদের কোন ঋণ যথাসময়ে পরিশোধ করা না হলে চক্রবৃদ্ধি হারেই তার সুদ হিসাব করা হয়। প্রক্ষান্তরে চক্রবৃদ্ধি হারের সুদের ঋণও যদি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই পরিশোধ করা হয় তাহলে সেক্ষেত্রে সুদের হার সরলই হবে। সুদের হারের সুবিধজনক সমন্বয়ের মাধ্যমে চক্রবৃদ্ধি হারের সুদের ঋণকেও সরল সুদের হারে ঋণ হিসাবে দেখানো সম্ভব। বছর শেষে দেয় টাঃ ১০০/০০ এর ১০’৫৫% হারের সরল সুদের ঋণ এ ভাবেও প্রকাশ করা যায় যে, প্রতি ছয় মাস পর শতকরা ১০% চক্রবৃদ্ধি হরের হিসাবে ঐঋণ পরিশোধ করা যাবে। উভয় ক্ষেত্রেই ঋণ গ্রহীতাকে টাঃ ১০০/০০ এর জন্যে টাঃ ১১০.৫৫ পরিশোধ করতে হবে। অনূরুপ ভাবে সুদের নিম্ন হার ও উচ্চ হার সম্পর্কে ধারণাও আপেক্ষিক, চুড়ান্ত বা সন্দেহাতীত অবিমিশ্র নয়। যেমন শতকরা ১০% হারের সরল সুদে কোন ব্যাংক ঋণদশ বছরে দ্বিগুণ হয়। একে আমরা কি ভাবে বিবেচনা করব? কেউ কেউ একে উচ্চ হারের সুদ বলে গণ্য করবেন। কিন্তু এমনও অনেক লোক রয়েছেন যারা এই হারকে যথেষ্ট নীচু হার বলে বিবেচনা করবেন্। এসব কারনেই ইসলামে সোজা-সুজি সুদকে তার সকল রুপেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ইসলামী শরীয়তের প্রেক্ষাপটে ইসলামি ব্যাংক

বিশ্বের সকল ইসলামী ব্যংক যে সিদ্ধান্তে পরিপুর্ণ একমত তা হচ্ছে ইসলাম সুদকে ( তা যে নামে বা যে রুপেই আসুকনা কেন) হারাম ঘোষণা করেছে। ইসলামী শরীয়তের উপর গভীর গবেষনা ও ব্যাপক পর্যালোচনার পরই তারা এই ঐক্যমতে পৌছেছেন। উপরন্তু তারা এ ব্যাপারে বহু খ্যাতনামা পন্ডিত, অর্থনীতিবিদ, গবেষকম আইসজীবী এবং ইসলামের বিভিন্ন মাযহাবের শরীয়ত বিশেষজ্ঞ ও ফকীহদের নিকট হতে যথাবিহিত অনুমোদন ও রায় লাভ করেছেন। সুদের সঙ্গা দিতে গিয়ে তাঁরা বলেছেন ঋণ দেওয়া মূল অর্থে যাই উৎপন্ন করুক না কেন তার বিচার না করে ঐ ঋণের উপর পূর্ব নির্ধারিত পরিশোধিতব্য অর্থই হলো সুদ।

যদিও আল- কুরআন ও সুন্নাহে সুদকে সুস্পষ্ট ভাষায় হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং সমগ্র বিশ্বে চল্লিশটির বেশি ইসলামী ব্যাংক ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানে এই নির্দেশ বাস্তবে কার্যকর করা হয়েছে, তবুও অনেকের কাছে এ ব্যাপারে বেশ কিছু প্রশ্ন, সংশয় বা বিভ্রান্তি এখনো রয়ে গেছে। বৈশিষ্টের দিক থেকে এগুলোকে দু’টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যথা :

(ক) ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি ও উদ্দশ্যের ব্যখ্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত সংশয় বা প্রশ্ন এবং

(খ) আর্থ সামাজিক ও প্রকৌশলগত উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে সুদ উচ্ছেদ করার সম্ভাবনা ও বাঞ্ছনীয়তা প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন বা সংশয়।

এই অধ্যায়ে শুধু মাত্র প্রথম ধরনের বিভ্রান্তি বা প্রশ্নের আলোচনা করা হয়েছে। পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে দ্বিতীয় ধরনের বিভ্রান্তি বা সংশয়গুলো সম্পর্কে।

আইন কাকে বলে?

      উত্তর : ভূমিকা : আইন শব্দটি কেবল আইনজীবীগণ কর্তৃক ব্যবহৃত নয়, এটি জ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- বৈজ্ঞানিকগণ মাধ্যাকর্ষণের আইনের কথা বলেন, ধর্মতাত্ত্বিকগণ ওহীভিত্তিক আইনের কথা বলেন। আবার কখনো সম্মান প্রদর্শন আইন, দাবা খেলা আইন প্রভৃতি আইনের কথাও শুনা যায়।যদিও এ আইনগুলো আদালতের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত নয়। সর্বোপরি আইন হলো কোন বিষয়, ঘটনা বা পদ্ধতির বিধিবদ্ধ নিয়ম।

     আইনের পরিচয় : বাংলা ভাষায় আইন শব্দটিকে বুঝাতে ইংরেজিতে দুটি শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় Law এবং Act. আইনের মূলে যে সূত্র আছে, তাকে আইন বা Law বলে। যেমন- Laws on Evidence, Laws on Contract. Act বিষয়টি ভিন্নভাবেও দেখা হয়। সংসদ যে আইন পাস করে তাকে Act বলে। বাংলা ভাষায় Law এবং Act এই দু’টি শব্দের জন্যই আইন শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত দু’টি অনুবাদ গ্রন্থ ‘অংশীদারি আইন’ ও পণ্য ‘বিক্রয় আইন’ এ Act এর স্থলে ‘আইন’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আইন শব্দটি ফারসি শব্দ। আব্বাসী যুগে এর ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এটি কানুন, প্রথা, নিয়ম ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হতো। বিশিষ্ট আইনজ্ঞ গাজী শামসুর রহমান বলেন : ‘আইন হচ্ছে মানুষের মধ্যে যে সময়ের জন্য যে আইন প্রণীত হয়ে সেকালের ধারণানুযায়ী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রও অনুমোদিত বা সেই সময়কার সার্বভৌম শক্তি অনুমোদিত অবশ্য পালনীয় বিধিমালা। আইন বলতে মোটামুটিভাবে যে সময়ে প্রণীত হয় সেই সময়ে যাকে শৃঙ্খলা জ্ঞানকরা হয়, সে শৃঙ্খলার উদ্দেশ্য গৃহীত আদেশ-নিষেধ প্রভৃতি বুঝায়। মানুষ স্বভাবতই শৃঙ্খলাকামী। এ শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থেই মানুষ নীতিনির্ধারণ করে। আর সে আলোকেই আইনের সৃষ্টি হয়।

     উপসংহার : পরিশেষে বলতে হয়, আইন হলো মানুষের চলার পথের দিকনির্ধেশনা। আইন না থাকলে কোন কিছুই সুশৃঙ্খল নিয়মানুসারে চলতে পারে না।

 

সংগৃহীত : ইসলামি আইন, ব্যক্তিত আইন এবং উত্তরাধিকার আইন

বিষয় কোড – ২৩১৮১১

দিকদর্শন প্রকাশনী লিমিটেড