পূর্ববর্তী উম্মতের উপর রোযার হুকুম

পূর্ববর্তী উম্মতের উপর রোযার হুকুম :
মুসলমানদের প্রতি রোযা ফরয হওয়ার নির্দেশটি একটি বিশেষ নযীর উল্লেখসহ দেয়া হয়েছে। নির্দেশের সাথে সাথে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, রোযা শুধুমাত্র তোমাদের প্রতিই ফরয করা হয়নি। তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের ওপরও ফরয করা হেয়েছিল। এর দ্বারা যেমন রোযার বিশেষ গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে তেমনি মুসলমানদের এ মর্মে একটা সান্ত্বনাও দেয়া হয়েছে যে, রোযা একটা কষ্টকর ইবাদাত সত্য, তবে তা শুধুমাত্র তোমাদের ওপরই ফরয করা হয়নি। তোমাদের পূর্ববর্তী জাতীগুলোর ওপরও ফরয করা হয়েছিল। কেননা, সাধারণত দেখা যায় কোন একটা ক্লেশকর কাজে অনেক লোক একই সাথে জড়িত হয়ে পড়লে তা অনেকটা স্বাভাবিক এবং সাধারণ বলে মনে হয়। (রুহুল মাআনী)

কুরআনের বাক্য وَالَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُم অর্থাৎ যারা তোমাদের পূর্বে ছিল, ব্যাপক অর্থবোধক। এর দ্বারা হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সকল উম্মত এবং শরীয়তকেই বুঝায়। এতে বুঝা যায় যে, নামাযের ইবাদত থেকে যেমন কোন উম্মত বা শরীয়তই বাদ ছিল না, তেমনি রোযাও সবার জন্যই ফরয ছিল। যারা উল্লেখ করেছেন যে, مِنْ قَبْلِكُم বাক্য দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মত নাসারাদের বুঝানো হয়েছে। তারা বলেন, এটা ‍উদাহরণ স্বরুপ উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যান্য উম্মতের ওপর রোযা ফরয ছিল না। তাদের কথায় এ তথ্য বুঝায় না। (রুহুল মাআনী)

আয়াতের মধ্যে শুধু বলা হয়েছে যে রোযা মুসলমানদের ওপর যেমন ফরয কারা হয়েছে তেমনি পূর্ববর্তী  ‍উম্মতগণের ওপরও ফরয করা হয়েছিল। এ কথা দ্বারা এ তথ্য বুঝা যায় যে, আগেকার উম্মতগণের রোযা সমগ্র শর্ত ও প্রকৃতির দিক দিয়ে  মুসলমানদের ওপর ফরযকৃত  রোযার অনুরুপ ছিল না। যেমন- রোযার সময়-সীমা, সংখ্যা এবং কখন তা রাখা হবে এসব ব্যাপারে আগেকার উম্মতদের রোযার সাথে মুসলমানদের রোযার পার্থক্য হতে পারে,বাস্তব ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। বিভিন্ন সময়ে রোযার সময়-সীমা এবং সংখ্যার ক্ষেত্রে পার্থক্য হয়েছে।

لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ  বাক্যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, তাকওয়া বা পরহেযগারীর শক্তি অর্জন করার ব্যাপারে রোযার একটা বিশেষ ভূমিকা বিদ্যমান। কেননা, রোযার মাধ্যমে প্রবৃত্তির তাড়না নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে বিশেষ শক্তি অর্জিত হয়। প্রকৃত প্রস্তাবে সেটাই তাকওয়া বা পরহেযগারীর ভিত্তি।

عَـنْ سَـلْـمَان الفَارْسِىؓ قَالَ خَـطَـبَـنَا رَسُـوْلُ اللهؐ فِىْ اٰخِرِيَـوْمٍ مِّنْ شَـعْـبَانَ فَـقَالَ يَا اَيُّهَا الـنَّاسُ قَـدْاَظَـلَّـكُمْ شَهْـرٌ عَـظـيْمٌ شَهْـرٌمُبَارَكٌ شَهْـرٌ فِـيْهِ لَـيْـلَـةٌ خَـيْـرٌ مِـنْ اَلْـفِ شَهْـرِـ شَهْـرٌ جَعَلَ اللهُ صِيَامَهٗ فَـرِيْـضَةٌ وَقِـيَامَ لَـيْـلَـهٖ تَطَوَّعًا ـ مَنْ تَـقَـرَّبَ فِـيْهِ بِخَصْلَةٍ مِّنَ  التَّطَوَّعَ كَانَ كَـمَـنْ اَدّٰى فَرِيْضَةً فِـيْـمَا سَوَاهٗ ـ وَمَنْ اَدّٰى فِـيْهِ فَـرِيْضَةً كَانْ كَـمَـنْ سَبْعِـيْـنَ فَرِيْضَةً ـ فِـيْمَا سَوَاهٗ وَهُوَ شَهْرُ الصَّبَرْ وَالصَّبْرُ ثَـوَابُهُ الْجَنَّةِ وَشَهْـرُالْمُوَاسَاةِ وَشَهْـرٌيُزَادُ فِـيْهِ رِزْقُ الْمُؤْمِنِ ـ مَنْ فَـطَّرَ فِيْهِ صَائِمًا كَانَ مَغْـفِـرَةً لِذُنُوْبِهٖ وَعِـتْـقُ رَقَـبَتِهٖ مِنَ النَّارِ وَكَانَ لَهٗ مِـثْـلُ اَجْـرِهٖ مِنْ غَـيْـرِاَنْ يَّـنْـقُـصَ مِنْ اَجْرِهٖ شَئٌّ قَالُوْا يَارَسُوْلَ اللهِ لَـيْـسَ كُـلُّـنَا يَجِـدُ مَا يُـفَـطِّرُ الصَّائِمَ فَـقَالَ رَسُوْلُ اللهِؐ يُعْـطِى اللهُ هٰذَا الثَّـوَابَ مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا عَلٰى تَـمَرَةٍ اَوْ شَرْبَةِ مَاءٍ اَوْمَـذَقَـةِ لَـبَـنٍ وَهُـوَ شَهْـرٌ اَوَّلَهٗ رَحْـمَةٌ وَاَوْسَطُهٗ مَغْـفِـرَةٌ وَاٰخِرُهٗ عِـتْـقٌ مِّنَ النَّارِ وَمَنْ خَفَّـفَ عَنْ مَـمْلُوْكِهٖ غَـفَّـرَ اللهُ لَهٗ وَاَعْـتَـقَـهٗ مِنَ النَّارِ وَاسْـتَـكْـثِـرُوا فِـيْهِ مِنْ اَرْبَعِ خَـصَالٍ خَـصْلَـتَـيْـنِ تُـرْضَوْنَ بِهِـمَا رَبَّـكُـمْ وَخَـصْلَـتَـيْـنِ لَاغِـنَاءَ بِكُمْ عَـنْهُـمَا فَاَمَّا الْخَـصْـلَـتَانِ الـلَّـتَانِ تُـرْضَوْنَ بِهَا رَبَّـكُمْ فَـشَهَادَةُ اَنْ لَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَتَـسْـتَـغْـفِـرُوْنَهٗ وَاَمَّا الْخَصْلَـتَانِ الـلَّـتَانِ لَا غِـنَاءَبِكُمْ عَـنْهُـمَا لَـتَـسْـئَـلُـوْنَ اللهَ الْجَـنَّةَ وَ تَـعَـوَّذُوْنَ بِهٖ مِنَ الـنَّارِ وَمَنْ سَقٰى صَائِمًا سَقَاهُ اللهُ مِنْ حَوْضِىْ شَرْبَةً لَا يَـظْمَأُ حَتّٰى يَـدْخُلَ الْـجَـنَّـةَ ـ (رواه ابن خزيمة فى صحيحه و رواه البيقى)

হযরত সালমান ফারসী (রা) হতে বর্ণীত আছে যে, তিনি বলেন, নবীজী (সাঃ) শা’বানের শেষ তারিখে আমাদেরকে নসীহত করেছেন যে, হে লোকেরা! সত্বর তোমাদের মাথার ওপর মর্যাদাশীল মুবারক মাস ছায়া স্বরূপ আসতেছে। যার মধ্যে (শবে কদর নামে) একটি রাত যা হাজার মাস হতে উত্তম। আল্লাহ তায়ালা সিয়ামকে তোমাদের ওপর ফরয করেছেন এবং রাত জাগরণ (তারাবীহ পড়াকে) তোমাদের জন্য পূণ্যের কাজ দিয়েছেন। আর যে এ মাসে একটি নফল আদায় করল সে যেন রমযানের বাইরে একটা ফরয আদায় করল। আর যে এ মাসে একটা ফরয আদয় করল সে যেন অন্য মাসে সত্তরটা ফরয আদায় করল।

হুযুর (সাঃ) আরও বলেন, ইহা সবরের মাস এবং সবরের পরিবর্তে আল্লাহ তায়ালা বেহেশত রেখেছেন এবং মানুষের সাথে সহানুভূতির মাস। এ মাসে মু’মিন লোকদের রিযিক বাড়িয়ে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি কোন  সায়েম (রোযাদারকে) ইফতার করাবে তার জন্য এটা গুনাহ মাফ ও দোযখের অগ্নি হতে নাজাতের কারণ হয়ে দাড়াবে এবং উক্ত সায়েম (রোযাদারের) সাওয়াব হতে সমতুল্য সাওয়াব সেও লাভ করবে। অথচ সায়েম (রোযাদারের) সাওয়াব হতে বিন্দু পরিমাণও কম হবে না। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে অনেকের এ সামর্থ্য নেই যে, অপরকে ইফতার করাবে। অর্থাৎ পেট ভরে খাওয়াবে। হুযুর (সাঃ) বলেন, পেট ভবে খাওয়ানো জরুরী না, যে  কাউকে একটি খেজুর দ্বারা ইফতার করাবে এক ঢোক পানি পান করাবে অথবা সামান্য দুধ দিয়ে ইফতার করাবে তাকেও সে সাওয়াব প্রদান করা হবে। হুযুর (সাঃ)  আরো বলেন, এ মাস এমন একটি মাস  যার প্রথম দিকে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ্ হয, দ্বিতীয়াংশে মাগফিরাত, তৃতীয়াংশে দোযখ হতে  মুক্তি দেয়া হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে আপন গোলাম ও মজদুর হতে কাজের বোঝা হালকা করে দেবে আল্লাহ তায়ালা তাকে মাফ  করে দেবেন এবং দোযখের অগ্নি থেকে নাজাত দান করবেন। হুযুর (সাঃ) আরো বলেন, চার কাজ রমযান মাসে বেশি  বেশি করে করবে দু’কাজ আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য এবং যা না করে উপায় নেই প্রথম দুই কায, যার দ্বারা আল্লাহকে সন্তষ্টি করবে তা হচ্ছে, কালিমায়ে তাইয়িবা এবং আস্তাগফিরুল্লাহ বেশি বেশি করে পড়বে। অন্য দু’ কাজ এই যে, আল্লাহ তায়ালার নিকট বেহেশতের প্রার্থনা করবে এবং দোযখ হতে পানাহ চাবে। যে ব্যক্তি এ মাসে কোন সায়েম (রোযাদারকে) পানি পান করাবে আল্লাহপাক কেয়ামতের দিন তাকে আমার হাউজে কাওসার হতে এমন পানি পান করাবেন যার  পর বেহেশতে প্রবেশ পর্যন্ত আর কোন পিপাসা হবে না।

** উল্লিখিত হাদীসে কয়েকটি জরুরী বিয়য়ের ওপর ইঙ্গিত করা হয়েছে।**

“তারাবীহ্ ও শবে কদরের ফযীলত”

প্রথমত : শা’বানের শেষ তারিখে গুরুত্বপূর্ণ খুতবা দিয়ে সবাইকে সাবধান করে ‍দিয়েছেন। যাতে রমযানের একটি মুহুর্তও বৃথা না যায়। অতঃপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে সর্বপ্রথম শবে কদর, যা অতি গুরুত্বপূর্ণ রাত।

দ্বিতীয়ত : আল্লাহ তায়ালা সিয়ামকে (রোযাকে) ফরয করেছেন এবং তার রাত জাগরণ ও তথায় সালাতুুত তারাবীহকে সুন্নাত করেছেন। এতে প্রমাণিত হল তারাবীহ আল্লাহর তরফ হতে এসেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে হুযুর (সাঃ) যে নিজের সুন্নাত বলে অবহিত করেছেন তা অধিক তাকীদের জন্য বলা হয়েছে। এ কারণেই একমাত্র রাফেজী সম্প্রদায় ছাড়া সকল মুসলমানদের নিকট এটা অপরিহার্য সুন্নাত। হযরত মাওলানা শাহ্ আবদুল হক সাহেব মুহাদ্দিসে দেহলভী “মা সাবাতা বিস-সুন্নাত” নামক গ্রন্থে উল্লেক করেছেন যে, কোন শহরবাসী যদি তারাবীহ ছেড়ে দেয় তবে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা বাদশাহের কর্তব্য।

 

তারাবীহ্ ও শবে কদরের ফযীলত

তারাবীহ্ ও শবে কদরের ফযীলত :

১। তারাবীহ্ : পবিত্র হাদীসে আছে সত্যই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর রমযানের রোযা ফরয করে দিয়েছেন এবং তার রাতের নামায ( তারাবীহ্) সুন্নাত করেছেন। অতএব, যে ব্যক্তি রমযানের দিনে রোযা রাখবে ও রাতে নামায (তারাবীহ্) পড়বে ঈমান ও সাওয়াবের উদ্দেশ্য সহকারে এটা (অর্থাৎ রোযা ও তারাবীহ্‌) তার পূর্ববর্তী যাবতীয় (সগীরা) গুনাহর জন্য কাফফারা হয়ে যাবে। (অর্থাৎ সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যাবে) সুতরাং এ মাসে অধিক পারিমাণ নেক আমল করা উচিত। কেননা, এ মাসে একটি ফরয আদায় করলে সত্তরটি ফরসের সমান এবং একটি নফল একটি ফরযের সমান হয়ে থাকে।

২। শবে কদর : আল্লাহপাক বলেন,  لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ اَلْفِ شَهْرٍ  কদরের রাত সমগ্র মাস হতে শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ এ রাতে ইবাদত বন্দেগী করে যে সাওয়াব পাওয়া যায় তা এ রাত বাদ দিয়ে সহস্র মাসের ইবাদত-বন্দেগী করেও এতটুকু সাওয়াব পাবে না।

উক্ত আয়াতের শানে নূযুল (অর্থাৎ কি উপলক্ষে এটা নাযিল হয়েছিল সে সম্পর্কে ইমাম সুয়ূতী (রহ) তার ‘লবাবুননুকুল’ নামক কিতাবে লিখেছেন, একদা জনাব রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বনী ইসরাঈল গোত্রের এক ব্যক্তি সম্বন্ধে আলোচনা প্রসঙ্গে বলতে ছিলেন যে, ওই ব্যক্তি একহাজার মাস আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদ কার্যে) অস্ত্র শস্ত্রে সিজ্জিত রয়েছিল। এটা শুনতে পেয়ে উপস্থিত সাহাবাগণ বিস্ময় প্রকাশ করলেন এবং সকলে বলতে লাগলেন হায়! আমাদেন ভাগ্যে এটা জুটবে কেমন করে? তখন এটা নাযিল হল।

অপর এক বিবরণ মতে বনী ইসরাঈলের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি সারা রাত ইবাদাত করতেন এবং দিনের বেলায় সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতেন। এভাবে তিনি একহাজার মাস (৮৩ বছর ৪ মাস) অতিবাহিত করেছেন। তখন এটা নাযিল হয়েছিল।  অর্থাৎ আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই আমি এ কুরআন কদরের রাতে (শবে কদরে) অবতীর্ণ করেছি। জান এ শবে কদর কী? শবে কদর সহস্র মাস অপেক্ষা অধিক শ্রেষ্ঠ (যে সহস্র মাস কথিত ব্যক্তি আল্লাহর রাহে অস্ত্র সজ্জিত রয়েছে বা ইবাদত ও জিহাদ করে কাটিয়েছে।)

অতএব, আমার মুসলমান ভাই বোনেরা! এ পবিত্র রাতের কদর কর, এটার যথাযোগ্য মর্যাদা দাও। দেখ, সামান্য মেহনত দ্বারা কি বিরাট সাওয়াব লাভ হচ্ছে। এ রাতে বিশেষভাবে দোয়া কবুল হয়ে থাকে। সারা রাত জেগে ইবাদত ও দোয়ায় কাটিয়ে দিতে আগ্রহী হও। সাহস করলে অনায়াসে বিরাট সাওয়াব লাভ করতে পারবে। মাহরুম হওয়া বড়ই দুর্ভাগ্যের কথা।

হাদীস : প্রাণের নবী (সাঃ) বললেন, এ মাসে (রমযানের মাস) তোমাদের নিকট এসে পড়েছে। এটার মধ্যে এমন একটি রাত আছে যা সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। যে কেউ এ রাত (এবং এটার বরকত ও ইবাদত-বন্দেগী) হতে মাহরুম হল সে (যেন) সর্ববিধ কল্যাণ হতে মাহরুম। (অর্থাৎ এ রাতের অমূল্য বরকত যে না পেয়েছে এবং যে এ রাতের কিছু না কিছু ইবাদত করতে না পেরেছে বাস্তবিকই সে চিরবঞ্চিত ও হতভাগা । (ইবনে মাজাহ)

হাদীস : প্রাণের নবী (সাঃ) আরো বললেন, সত্য বলতে কি আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন তবে তোমাদেরকে কোন রাতটি শবে কদর  তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতেন। (কিন্তু নানা রুপ হেকমত ও গোপন রহস্য রয়েছে বলে এ রাত নির্দিষ্ট করে দেননি।) তোমরা এটা এ মাসের শেষের সাতটি  রাতে খুজতে থাক এবং এ রাতগুলোতে জেগে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাক, যেন শবে কদর ও এটার সামান্য বরতক তোমাদের ভাগ্যে ঝুটে। (হাকীম)

হাদীস : হুযুর (সাঃ) বলেন, শবে কদর প্রতিটি রমযানেই হয়ে থাকে। (আবু দাউদ) এ হাদীসেরই পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, শবে কদর ২৭শে রমযানে হয়ে থাকে। (আবু দাউদ)

কোন রাতটি শবে কদর? এ বিষয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশের মতে ২৭শে রমযান। বেশি ভাল হয় যদি সাহসে ভর করে শেষের দশ রাত জাগরণ করতে পারে। এ কথা ভুল যে, ওই রাতে এটার কিছু আলামত দেখতে পেলেই তবে বরকত হাসিল হবে। অন্যথায় নয় বরং কিছু দেখা যাক বা না যাক ইবাদাত করতে থাকবে এবং বরকত  হাসিল করতে যত্নবান হবে। এ রাতে দান করার উদ্দেশ্য হল যে, সকল বরকত ও সাওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তা হাসিল করার জন্য ইবাদত-বন্দেগীতে নিরবত থাকবে। কোন কিছু দেখা বা দেখানো উদ্দেশ্য নয়।

সাহরী ও ইফতারের মাসায়েল

ই’তিকাফের কতিপয় জরুরী মাসায়েল

ই’তিকাফের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল : 

  • পুরুষদের ই’তিকাফ শুদ্ধ হওয়ার জন্য ৩টি বিষয় অপরিহার্য। যথা –

(ক) জামায়াতের সাথে নামায হয় এমন কোন মসজিদে বসা।

(খ) ই’তিকাফের নিয়ত করে বসা।

(গ) জানাবত (নাপাকী) হতে  পাক পবিত্র হওয়া।

সুতরাং নিয়ত বা ইচ্ছা ব্যতীত মসজিদে বসে থাকার নাম ই’তিকাফ নয়। তা যত অধিক সময় হোক না কেন। আর নিয়ত  ‍শুদ্ধ হওয়ার জন্য যেহেতু মুসলমান ও আকেল বা হুশ-জ্ঞান বিশিষ্ট হওয়া অপরিহার্য। সেহেতু নিয়তের সাতে এ দু’টিও এসে গিয়েছে। তাই পৃথকভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই।

  • ই’তিকাফের সর্বোত্তম স্থান কাবা শরীফের মসজিদ (মসজিদে হারাম). তারপর মদীনা শরীফের মসজিদে নববী, তারপর বাইতুর মুকাদ্দাসের মসজিদে আকসা, তারপর ওই মসজিদ যেখানে জামায়াতের সব্যবস্থা আছে। তারপর ওই মসজিদ যেখানে বড় বড় জামায়াতের সাথে নামায হয়ে থাকে।
  • ই’তিকাফ ৩ প্রকার : (ক) ওয়াজিব (খ) সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ও (গ) মুস্তাহাব। মান্নত করলে চাই তা শর্তহীন হোক কিংবা শর্তাধীন হোক উভয় অবস্থায় ই’তিকাফ ওয়াজিব হবে। শর্তহীন বা গায়রে মুয়াল্লাক। যেমন : কেউ কোন শর্ত না করে বলল আমি আল্লাহর ওয়াস্তে ই’তিকাফ করব। আর শর্তাধীন বা মুয়াল্লাক, যেমন : কেউ বলল যদি আমার অমুক কাজ সাধিত হয় তবে আমি আল্লাহর ওয়াস্তে ই’তিকাফ করব।

পবিত্র রমযান মাসের শেষ দশকের ই’তিকাফ  ‍সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। (অবশ্য ২৯ দিনের মাস হলে শেষের নয় দিনই দশকের স্থলবর্তী) রমযানের শেষ দশকে বিনা ব্যতিক্রমে জনাব হুযুরে আকরাম (সাঃ) প্রতি বছর ই’তিকাফ করেছেন বলে সহীহ হাদীসে প্রকাশ, অবশ্য সুন্নাতে কেফায়া, তাই মহল্লার কিছু লোক করে নিলে সবার পক্ষ হতে সমাধা হয়ে যাবে।

উক্ত  দু’প্রকার ব্যতীত অন্য সকল প্রকার ই’তিকাফ মুস্তাহাব। যেমন- রমযানের প্রথম অথবা দ্বিতীয় দশকের ই’তিকাফ অথবা অন্য কোন মাসের যে কোন সময়ের ই’তিকাফ।

  • যে ই’তিকাফ ওয়াজিব তার জন্য রোযা রাখা শর্ত। অর্থাৎ যখন কেউ এরূপ ই’তিকাফ করবে তখন তাকে রোযা পালন করতে হবে। বরং কেউ যদি নিয়ত করে যে, সে রোযা রাখবে না তবুও তাকে রোযা রাখতে হবে। এ জন্যই যদি কোউ শুধু রাতের ই’তিকাফের নিয়ত করে থাকে তবে তা নিরর্থক বলে গণ্য হবে। কেননা, রাতে রোযার সময় নয়। হ্যাঁ যদি কেউ রাত দিনের নিয়ত  করে অথবা শুধু কয়োটি দিনের জন্য ই’তিকাফের নিয়ত করে তবে রাত আনুশঙ্গিকভাবে দিনের ভাগের সাথে সংযুক্ত হবে এবং রতেও ই’তিকাফ জারী রাখতে হবে। আর যদি কেউ শুধু একটি দিনের ই’তিকাফ করার মান্নত করে থাকে তবে রাত তার সাথে সংযুক্ত হবে না। আর একটি কথা লক্ষণীয় যে, এখানে যে রোযা রাখা শর্ত বলা হয়েছে সে রোযা বিশেষভাবে এ ই’তিকাফের জন্য রাখা জরুরী। বরং অন্য যে কোন উদ্দেশ্যে কোন ওয়াজিব রোযা ওই দিন রাখা হলেই হল। উদাহরণ স্বরূপ কেউ যদি রমযান মাসে ই’তিকাফের মান্নত করে তবে রমযানের রোযা এ ই’তিকাফের জন্য যথেষ্ট হবে। (এমনিভাবে ই’তিকাফের দিন যদি সে তার কোন মান্নতের বা কাফফারার রোযা রেখে থাকে তবে তা ই’তিকাফের জন্যেও যথেষ্ট হবে। হ্যাঁ এ রোযা ওয়াজিব হবে, নফল রোযা হলে চলবে না। যেমন- কেউ যদি নফল রোযা রাখে এবং রাখার পরে এ দিন ই’তিকাফের মান্নত করে তবে এটা শুদ্ধ হবে না। কেননা, প্রারম্ভে এ রোযা নফল ছিল অথচ ই’তিকাফ ওয়াজিব। যদি কেউ  পূর্ণ রমযান ই’তিকাফ করার মান্নত করে বসে এবং পরে অন্য কোন পূর্ণ এক মাস করে নিলে মান্নত পূর্ণ হয়ে যাবে, অবশ্য ওই এক মাস সবিরাম না করে অবিরাম রোযা ও ই’তিকাফ করতে হবে।
  • সুন্নাত ই’তিকাফ তো রমযানে হয়ে থাকে। এ কারণে এটার জন্য রোযা শর্ত বলে উল্লেখ করার আর প্রয়োজন নেই। 
  • মুস্তাহাব ধরনের ই’তিকাফ ও রোযা রাখা উত্তম। কিন্তু মাযহাব অনুযায়ী এটা শর্ত নয়।
  • ওয়াজিব জাতীয় ই’তিকাফ এক দশক। কেননা, এটার জন্য রমযানের শেষ দশক নির্ধারিত। আর মুস্তাহাব জাতীয় ই’তিকাফের জন্য কোন সময় সীমা নির্ধারিত নয়। এমনকি তা ১ মিনিট বা তদপেক্ষাও কম হতে পারে।
  • ই’তিকাফ অবস্থায় দু’প্রকার কাজ করা হারাম। অর্থাৎ এ দু’টির কোন একটি করলে ওয়াজিব ও সুন্নাত জাতীয় ই’তিকাফ সমূলে নষ্ট হয়ে যাবে এবং তখন এটার কাযা করা অপরিহার্য কর্তব্য। অবশ্য এ ই’তিকাফ যদি মুস্তাহাব হয়ে থাকে। তবে তা খতম  হয়ে যাবে। যেহেতু মুস্তাহাব জাতীয় ই’তিকাফের জন্য কোন সময় সীমা নির্দিষ্ট নয়, এ জন্য এটার কাযা করতে হবে না। এ দু’প্রকার কাজ নিম্নরূপ : 

প্রথমত :বিনা কারণে ই’তিকাফের স্থান ত্যাগ করা। সে কারণ বা প্রয়োজন প্রকৃতিগত হোক কিংবা শরীয়তসম্মত হোক। সমষ্টির উদাহরণ যেমন- পায়াখানা, প্রস্রাব, জানবতের গোসল ইত্যাদি। পানাহারের প্রয়োজন ও এ শ্রেণীর অন্তর্গত। আর দ্বিতীয়টির উদাহরণ যেমন- জুময়ার নামায।

দ্বিতীয় : ওই সমস্ত কার্যকলাপ যা ই’তিকাফ অবস্থায় না জায়েয ও অবৈধ যেমন – স্ত্রী সহবাস করা ইত্যাদি। এটা ইচ্ছাকৃত হোক বা ভুলক্রমে হোক ই’তিকাফ স্মরণ না থাকার  দরূণমসজিদের ভিতরে হোক অথবা মসজিদের বাইরে হোক সর্বাবস্থায় ই’তিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। আর যে সমস্ত কাজ সহবাসের অনুষঙ্গ যেমন- চুমা বা আলিঙ্গন ইত্যাদি। এটাও ই’তিকাফের হালাতে অবৈধ। তবে এটার দ্বারা ই’তিকাফ সমূলে নষ্ট হবে না। যদি না বীর্যস্খলন হয়। হ্যাঁ, যদি এ সমস্ত কাজ দ্বারা বীর্যস্খলন ঘটে তাহলে ই’তিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। অবশ্য শুধু ধ্যান ও কল্পনার কারণে বীর্যস্খলন ঘটলে ই’তিকাফ নষ্ট হবে না। 

“ই’তিকাফের ফযীলত”

  • কোন প্রয়োজনবশত যদি কেউ তার ই’তিকাফের মসজিদ হতে বাইর হয় তবে প্রয়াজন শেষ হওয়ার সাথে সাথে সেখানে দেরি না করে ভেতরে এসে পড়বে এবং সর্বদা যথা সম্ভব মসজিদের নিকটেও অনতি দূরে প্রয়োজন মিটানোর চেষ্টা করবে। যেমন- পায়খানায় যেতে হলে যদি নিকটে পায়খানার ব্যবস্থা থাকে তবে সেখানেই যাবে। অন্যথায় যদি তার নিজ বাড়ি দূরে হয় এবং কোন বন্ধু বা পরিচিত জনের বাড় নিকটে থাকে তবে সেখানেই যাবে। হ্যাঁ যদি তার নিজের বাড়িতে পায়খানায় না বসলে প্রয়োজন পুরা মাত্রায় মিটবে না বলে স্বভাবগতভাবে তার ধারণা জন্মে তবে সেখানে যাওয়া দুরুস্ত আছে। যদি কেউ জুময়ার নামাযের জন্য কোন জামে মসজিদে গিয়ে থাকে ই’তিকাফের বাকী সময় পুরা করে তবে তা দুরুস্ত আছে। অবশ্য মাকরূহ হবে।
  • বিনা প্রয়োজনে এমনকি ভুলক্রমেও ই’তিকাফের মসজিদ এক আধ মিনিটের জন্য ত্যাগ করে বাইরে যাওয়া দুরুস্ত নয়।
  • প্রায় ঘটে থাকে এরূপ কারণ ব্যতীত অন্য কারণে নিজের ই’তিকাফের স্থান ত্যাগ করা ই’তিকাফ বিরোধী কাজ। যেমন- কোন রোগীর সেবার জন্য বাইরে যাওয়া অথবা কেউ পানিতে ডুবে যাচ্ছে তাকে বাঁচানোর জন্য অথবা আগুন নিভানোর জন্য অথবা মসজিদ ধ্বসিয়ে পড়ার আশঙ্কায় বাইর হওয়া। যদিও অনরূপ অবস্থায় বাইরে যাওয়া দুরুস্ত আছে। বরং প্রাণ রক্ষার খানিরে তখন বাইরে যাওয়া জরুরী বটে কিন্তু তথাপি ই’তিকাফ থাকবে না। আর যদি কোন বৈধ প্রয়োজনে মসজিদের বাইরে যেতে হয় এবং তখন ওই প্রয়োজ পুরা করার আগে বা পরে কোন রোগী দেখে নেয় বা কোন জানাযার নামাযে শরীক হয় তবে কোন ক্ষতি নেই।
  • জুময়ার নামাযের জন্য এমন সময় হাতে নিয়ে বাইর হবে যে, ওখানে যেয়ে তাহিইয়াতুল মসজিদ ও জুময়ার সুন্নাত পড়তে পারে এবং ফরযের পরেও সুন্নাত পড়ার জন্য দেরি করা দুরুস্ত আছে। তবে এ সকল কাজের জন্য সময় কি পরিমাণ হবে তা ওই ব্যক্তির নিজস্ব অনুমান ও আন্দাযার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অনুমান যদি ভুল হয়ে পড়ে অর্থাৎ কিছুক্ষণ পূর্বে ওখানে পৌছে যায় তবে এতে ক্ষতি হবে না।
  • কোন ব্যক্তিকে যদি জোর জবরদস্তি করে তার ই’তিকাফের মসজিদ থেকে বাইর করে নেয়া হয়। যেমন- কোন অপরাধের দরূণ হাকীম তাদের নামে ওয়ারেন্ট জারি করেন এবং সে মতে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায় অথবা সে কারো নিকট ঋণী ছিল এবং ওই পাওনাদার ঋণ উসুল করার জন্য জোর করে তাকে বাইরে নিয়ে যায় তবুও তার ই’তিকাফ থাকবে না।
  • অনুরূপভাবে যদি কেউ তার বৈধ প্রয়োজনে বাইর হয় এবং কোন পাওনাদার তাকে রাস্তায় আটক করে ফেলে অথবা  অসুখ হয়ে পড়ে এবং পুনরায় স্বস্থানে যেতে কিছু দেরি হয়ে যায় তাতেও ই’তিকাফ  নষ্ট হয়ে যাবে।
  • ই’তিকাফের হালাতে বিনা প্রয়োজনে কোন দুনয়াবী (পার্থিব) কাজের ব্যাপৃত হওয়া মাকরূহে তাহরিমী। যেমন- বিনা প্রয়োজনে ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবসার কোন কাজ কারবার আরম্ভ করে দেয়া। হ্যাঁ, যদি অপরিহার্য হয়ে পড়ে, যেমন- বাড়িতে খোরাকির ব্যবস্থা নেই এবং অন্য কোন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি এ কাজের জন্য না জুটে তবে ক্রয়-বিক্রয় করা দুরুস্ত আছে। কিন্তু বিক্রয়ের বস্তু মসজিদের ভিতরে আনা কোন অবস্থায় জায়েয নেই। অবশ্য ওই বস্তু মসজিদে আনার দরুণ যদি মসজিদেন ফরশ নষ্ট হওয়া বা স্থান সঙ্কুচিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তবে কেউ কেউ তা দুরুস্ত বলেছেন।
  • ই’তিকাফের সময় একেবারে  চুপচাপ বসে থাকাও মাকরূহে তাহরিমী। হ্যাঁ, কু’কথা বলবে না, গীবত শেকায়াত করবে না, বেহুদা গল্প-গুজব করবে না। বরং কুরআন মাজীদ তেলাওয়াত করবে। নবী (সাঃ) এর জীবনের আলোচনা করবে, আওলিয়া চরিত্র পাঠ করবে। ধর্ম বিষয়ে লেখাপড়া করবে অথবা যে কোন ইবাদতে লিপ্ত থাকবে। মোটকথা- নিশ্চুপ বসে থাকা কোন ইবাদত নয়।

ই’তিকাফের ফযীলত

ই’তিকাফের ফযীলত 

হাদীস : হুযুর আকরাম (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমযানের (শেষ) দশদিন ই’তিকাফ করবে তা (সাওয়াব এর দিক দিয়ে) দুই হজ্জ ও দুই উমরার সমতুল্য। (বায়হাকী)

হাদীস : হুযুর (সা) বলেন, যে ব্যক্তি ই’তিকাফ করবে (তাকে দ্বীনের একটি ইবাদত হিসাবে) বিশ্বাস করে এবং সাওয়াব হাসিলের মনঃস্থ করে, তার পূর্বেকার যাবতীয় (সগীরা) গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী ও দায়লামী)

হাদীস : হুযুর (সা) বলেন, ইসলামী রাজত্বের সীমান্ত রকষার পূর্ণ কোর্স ৪০ দিন (অর্থাৎ একটানা ৪০ দিন সীমান্ত রক্ষার কাজে ব্যাপৃত থাকলে তার পূর্ণ ফযীলত লাভ করা সম্ভব) অতএব, যে ব্যক্তি সীমান্ত রক্ষাকল্পে ৪০ দিন নিয়োজিত থাকবে এমনকি ওই সময়ের মধ্যে ক্রয় বিক্রয় (ইত্যাদি নিজের  বা দুনিয়ার যাতীয় বৈধ কাজ পর্যন্ত) না করবে এবং কোন বেদায়াত ও পাপ কাজ না করবে সে ব্যক্তি যাবতীয় ( সগীরা) গুনাহ হতে ওই দিনের মত পাক পবিত্র হবে, যে দিন তার জননী তাকে প্রসব করেছে (অর্থাৎ সদ্যজাত বা নবজাত কচি শিশুর ন্যায় সম্পূর্ণরূপে নিষ্পাপ হয়ে যাবে।

উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হাদীস শাস্ত্রবিদ ও হাদীসের প্রখ্যাত ভাষ্যকার জনাব মুনাভী (রহ) বলেন, এখানে সীমান্ত রক্ষার্থে নফসকে পাপ পঙ্কিল হতে রক্ষা করা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কুপ্রবৃত্তি পরায়ন নফসকে সর্বক্ষণ নামায, রোযা ইবাদত বন্দেগী যিকর মুরাকাবাহ্ ইত্যাদিতে নিয়োজিত রেখে কাম ক্রোধ মোহ, মদ ইত্যাদি ষড় রিপুর আবর্তন হতে বাইর করতে তাকে সুষম ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী করার প্রতি সীমান্ত রক্ষী পুলিসের ন্যায় সদা জাগ্রত দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে হবে। আর ক্রয়-বিক্রয় করা ইত্যাদি কাজ থেকে যেমন সীমান্তরক্ষীদের দুরে থাকতে হয়। কেননা, কে বলতে পারে হয়ত এ অবসরে শক্ররা সীমান্ত পার হয়ে ভেতরে ঢুকার চেষ্টা করতে পারে। ঠিক তেমনিভাবে অপ্রয়োজনিয় দুনিয়াবী সর্ববিধ কার্যকলাপ পরিহার করে চলতে নফসকে বাধ্য করবে যেন ক্ষণিকের তরে গাফেল ও অমনোযগী হয়ে নফস কুপ্রবৃত্তির দ্বারা প্ররোচিত হতে না পারে।

উক্ত হাদীসে যুনূব বা পাপ অর্থে সগীরা বা ক্ষুদে পাপ বলা হয়েছে এ জন্য যে, মহাপাপ বা কবীরা গুাহ্ তাওবা ব্যতীত মাফ হয় না বলে প্রমাণ রয়েছে। তাও আবার হককুল্লাহ বা আল্লাহর কোন হক বা দাবি পুরণ না করার পাপ হলে তা তাওবার দ্বারা মাফ হতে পারে এবং বান্দার হক নষ্ট করা জনিত পাপ হলে যেমন- চুরি, ডাকাতি, যিনাকারী, গালি দেয়া, অপবাদ দেয়া, মানহানি করা ইত্যাদি, তা তাওবার পরেও সংশ্রিষ্ট বান্দার নিকট হতে ক্ষমা না নিলে সে পাপ মোচন সম্ভব নয়। (তাবারানী সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ)

ই’তিকাফ

ই’তিকাফ কি? ই’তিকাফ কেন আদায় করবো?

রমযান শরীফের ২০ তারিখে সূর্য অস্ত যাওয়ার অল্পক্ষণ পূর্ব হতে ২৯ বা ৩০ তরিখ অর্থাৎ ঈদের চাঁদ যে দিন দেখা যায় সে দিন শেষ হওয়া পর্যন্ত (পুরুষ হলে মসজিদে গিয়ে এবং) মেয়েলোকেরা নিজ নিজ ঘরের মধ্যে যে স্থান নামাযের জন্য নির্ধারিত করে নেয় সে স্থানে পাবন্দীর সাথে বসে থাকার নাম শরীয়াতের পরিভাষায় ই’তিকাফ। এটার সাওয়াব অতি বেশি, এ কাজ যখন হতে শুরু করবে তখন হতে পেশাব-পায়খানা অথবা খানা-পিনার অসুবিধা ছাড়া (এবং যে সব এলাকার লোক প্রত্যহ বা মধ্যে গোসল না করলে একটানা নয়, দশ দিন সহ্য করে থাকা মুশকিল ও স্বাস্থ্যহানি কর তাদের পক্ষে এরূপ গোসল করার প্রয়োজন ছাড়া) অন্য কোন সময় অনর্থক বাইরে যাওয়া দুরুস্ত নয়। এমনকি খানা পৌছায়ে দেয়ার অন্যরূপ ব্যবস্থা হয়ে গেলে এটার জন্যও সেখান থেকে বাইর হবে না। সর্বদা সেখানে থাকবে, সেখানে শুইবে। অতী ভাল হয় একেবারে  চুপ না থেকে বসে কুরআন মাজীদ তেলাওয়াত করা, নফল নামায আদায় করা এবং তাসবীহ তাহলীল পাঠ করা। মেয়েলোকেরা যদি তাদের হায়েয বা নিফাস হয়ে পড়ে তবে ই’তিকাফ ছেড়ে দেবে। কেননা, এ অবস্থায় এটা দুরুস্ত নয়। স্বামীর সাথে শোয়া, আদর-সোহাগ ইত্যাদি করাও তাদের পক্ষে জায়েয নয়। (পুরুষের পক্ষেও ই’তিকাফের হালাতে স্ত্রীর সাথে সহবাস, আলিঙ্গন ইত্যাদি দুরুস্ত নয়।

রোযা রেখে ভাঙা যায়

রোযা রেখে হঠাৎ যদি এমন কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে যে, কিছু দাওয়া পানি না খেলে জীবনের আশঙ্কা হতে পারে বা রোগ অত্যন্ত বেড়ে যেতে পারে তবে এরূপ অবস্থায় রোযা ছেড়ে দিয়ে ওষুধ সেবন করা জায়েয আছে। যেমন- হঠাৎ পেটে এমন বেদনা ওঠল যে, একেবারে অস্থির হয়ে পড়ল অথবা সাপে দংশন করল যে, ওষুধ না খেলে জীবনের আশা ত্যাগ করতে হয়। এরূপ যদি এমন ভীষণ পিপাসা  হয় যে, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায়, তবে এরূপ অবস্থায় রোযা ত্যাগ করে পানি পান করে জীবন বাঁচারো জায়েয আছে। কিন্তু রোযা রেখে এরূপ পরিশ্রম করা নিষেধ যাতে বিপন্ন হয়ে রোযা ছেড়ে দেয়ার আশঙ্কা থাকে।

সাহরী ও ইফতারের মাসায়েল

সাহরী ও ইফতারের মাসায়েল :

  • রোযা রাখার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে যা কিছু খাওয়া হয়, তাকে সাহরী বলে। সাহরী খাওয়া সুন্নাত। ক্ষুধা না থাকলে অন্তত ২/১ টি খোরমা খেলেও এই সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে।
  • সাহরীর সময় যদি কেউ ভাত না খেয়ে মাত্র ১ মুষ্টি চাল পানি দিয়ে খায় বা পান খায় তাতেও সাহরী খাওয়ার সাওয়াব হাসীল হয়ে যাবে।
  • সাহরী দেরি করে খাওয়া মুস্তাহাব, কিন্তু এত দেরি করা উচিত নয় যাতে রোযার মাঝে সন্দেহ আসতে  পারে।
  • সাহরী খাওয়ার আসল সময় সূর্যাস্ত হতে সুবহে সাদিক পর্যন্ত যে কয় ঘন্টা হয় তার ছয় ভাগের শেষ ষষ্ঠ ভাগ। যদি কেউ  এর পূর্বে ভাত ইত্যাদি খায়, কিন্তু চা পান ইত্যাদি এই শেষ ষষ্ঠাংশে করে, তবে তাতেও মুস্তাহাবের সাওয়াব হাসিল হবে।
  • যদি কোন রাতে ঘুম না ভাঙে এবং সে জন্য সাহরী খেতে না পারে, তবে সাহরী না খেয়েই রোযা রাখবে। খবরদার! সাহরী না খাওয়ার কারণে রোযা ছাড়বে না। সাহরী না খাওযার কারণে রোযা ছেড়ে দেয়া বড়ই কাপুরুষতার লক্ষণ এবং বড়ই গুনাহের কাজ।
  • যে পর্যন্ত সুবহে সাদিক না হয় অর্থাৎ পূর্ব দিকে সাদা বর্ণ না দেখা যায় সে পর্যন্ত সাহরী খাওয়া ‍দুরস্ত আছে। সুবহে সাদিক হয়ে গেলে তার পর আর কিছু খাওয়া-দাওয়া দুরুস্ত নয়।
  • যদি কেউ রাতে ওঠে এখনও রাত আছে সুবহে সাদিক হয়নি এ মনে করে সাহরী খায় বা পান, তামাক খায় এবং পরে জানতে পারে যে, ওই সময় রাত ছিল না, সুবহে সাদিক হয়ে গিয়েছিল, তবে ওই রোযা সহীহ  হবে না। ওই  রোযার পরিবর্তে আর একটি রোযা কাযা করতে হবে। কিন্তু ওই দিনেও  কিছু পানাহার করতে পারবে না। রোযা সহীহ হবে না বলে পানাহার শুরু করলে শক্ত গুনাহগার হবে। এরূপে যদি সূর্য ডুবে গিয়েছে এ মনে করে  ইফতার করে ফেলে এবং পরে জানতে পারে যে, সূর্য ডুবেনি, তবে ওই রোযা  সহীহ হবে না। ওই রোযা কাযা করতে হবে। কাফফারা দিতে হবে না। অবশ্য সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবশিষ্ট সময়টুকুতে কিছুই পানাহার করতে পারবে না।
  • রাতে ওঠে যদি সন্দেহ হয় যে, হয়ত সুবহে সাদিক হয়ে গেছে, তবে ওই সময় কিছু খাওয়া-দাওয়া মাকরুহ। এরূপ সন্দেহের সময় কিছু খেলে গুনাহগার হবে এবং রোযার কাযা করতে হবে। কিন্তু যদি ইয়াকিনীভাবে জানতে পারে যে, সুবহে সাদিক হয়নি, তবে রোযার কাযা করতে হবে না।
  • সূর্যাস্তের পর রোযা খোলার জন্য যা কিছু খাওয়া হয় তাকে ইফতার বলে। যখন নিশ্চিতরূপে জানা যায় যে, ষূর্য অস্ত গিয়েছে নিশ্চিভাবে জানা সত্ত্বেও অনর্থক দেরি করে ইফতার করা মাকরূহ।
  • আবরের (মেঘের) দিনে কিছু দেরি করে ইফতার করা ভাল। শুধু ঘড়িঘন্টার ওপর নির্ভর করা ভাল নয়। কারণ ঘড়িঘন্টাও প্রায় সময় ভুল হয়। অতএব আবরের দিনে যতক্ষণ ঈমানদার ব্যক্তির দিলে সূর্য অস্ত গিয়েছে বলে সাক্ষ্য দেয়, ততক্ষণ ইফতার করবে না। কারো আযানের ওপরও পূর্ণ নির্ভর করা উচিত নয়। কারণ মুয়াযযিনেরও ভুল হতে পারে। কাজেই ঈমানদারের দিলে গাওয়াহী (সাক্ষী) না দেয়া পর্যন্ত সবর করাই ভাল।
  • খোরমার দ্বারা ইফতার করা সবচেয়ে উত্তম। খোরমা বা অন্য কোন মিষ্টি জিনিস দ্বারা এবং তদভাবে  পানি দ্বারা ইফতার করা ভাল।
  • যে পর্যন্ত সূর্যাস্ত সম্বন্ধে কিছু সন্দেহ থাকে, সে পর্যন্ত ইফতার করা জায়েয নয়।
  • হযরত নবী করীম (সা) সূর্যাস্তের পর নামাযের  পূর্ব কয়েকটি খোরমা দ্বারা ইফতার করতেন। যদি খোরমা না  পেতেন, তবে কিছু পানি পান করতেন।

কাফফারা

কাফফারা :

  • রমযান শরীফের রোযা ভেঙে ফেললে একাধারে দু’মাস (অর্থাৎ ৬০ টি) রোযা রাখতে হবে। কিছু কিছু করে রাখলে চলবে না। লাগাতার ৬০ টি রোযা রাখতে হবে। যদি মাঝখানে ঘটনাক্রমে একদিনও বাদ  পড়ে, তবে তার পর হতে আবার ৬০ টি লাগাতার গণনা করে পূর্ণ করতে হবে। পূর্বেরগুলো হিসাবে ধরা হবে না। এমনকি যদি এ ৬০ দিনের মধ্যে ঈদের বা কুরবানীর দিনও আসে তবুও কাফফারা আদায় হবে না। পূর্বেরগুলো বাদ দিয়ে এর পর হবে ৬০ টি পূর্ণ করতে হবে। অবশ্য এ ৬০ দিনের  মধ্যে যদি মেয়েলোকের হায়েয আসে তবে তা মাফ। কিন্তু হায়েয হতে পাক হওয়ার পর দিন হতে আবার রোযা রাখতে হবে এবং ৬০ টি পূর্ণ করতে হবে। (সর্বমম্মতি ৬০ টি হলে চলবে)
  • নেফাসের কারণে যদি মাঝে মাধ্য ভাঙা পড়ে, তবে কফফারা আদায় হবে না। নেফাস হতে পাক হওয়ার পর ৬০ টি পূর্ণ করতে হবে। নেফাসের পূর্বে যদি কিছু রোযা রেখে থাকে, তা গণনায় ধরা যাবে না।
  • রোগের কারণে যদি মাঝখানে ভাঙা পড়ে, তবে রোগ আরোগ্য হওয়ার পর নতুনভাবে ৬০ টি রোযা পূর্ণ করত হবে। পূর্বেরগুলো হিসাব ধরা হবে না।
  • যদি মাঝখানে রমযানের মাস আসে, তবুও কাফফারা আদায় হবে না। রমযানের পর নতুনভাবে ৬০ টি রোযা পূর্ণ করলে কাফফারা আদায় হবে।
  • যদি কারও কাফফারার রোযা রাখার শক্তি না থাকে, তবে রমযান শরীফের একটি রোযা ভাঙলে তার পরিবর্তে ৬০ জন মিসকীনকে এক ওয়াক্ত পেট ভরে খানা খাওয়াতে হবে।
  • এ ৬০ জনের মধ্যে যদি চারজন এমন অল্প  বয়স্ক থাকে যে, তারা পূর্ণ খোরাক থেতে পারে না, তবে তদেরকে হিসাবে ধর যাবে না। তাদের পরিবর্তে চারজন পূর্ণ খোরাক খানেওয়ালা মিসকীনকে আবার খাওয়াতে হবে।
  • মিসকীনদেরকে শুধু ভাত, রুটি দিলে চলবে না, সঙ্গে ভাল তরকারি দিতে হবে। যদ্বারা আসুদা হয়ে (পেট ভরে) খেতে পারে ( দুধ, গোশত না দিলেও চলতে পারে)।
  • যদি ৬০ জন মিসকীনকে পাকায়ে না খাওয়ায়ে চাল, ধান বা পয়সা দিতে চায়, তবে তাও দুরুস্ত আছে। কিন্তু প্রত্যেক মিসকীনকে ৮০ তোলার সেরের  অন্তত ১ এক সের সাড়ে বার ছটাক গম বা তর মূল্যের পয়সা বা তত পয়সার চাল, ধান দিতে হবে। পূর্ণ ২ সের গম বা  তার মূল্যের চাল, ধান বা পয়সা দেয়াই বেহতর (উত্তম)। এ পরিমাণে ৬০ জন মিসকীনের প্রত্যেককে দিতে হবে।
  • যার ওপর কাফফারা ওয়াজিব হয়েছে তার বিনা অনুমতিতে যদি অন্য কেউ তার কাফফারা আদায় করে দেয়, তবে তাতে তার কাফফারা আদায় হবে না। আর যদি সে তার কাফফারা আদায় করে দেয়ার জ্য কাউকে অনুমতি দেয় বা আদেশ করে এবং তার পর সে ব্যক্তি আদায় করে দেয়, তবে তার কাফফারা আদায় হয়ে যাবে।
  • যদি একজন মিসকীনকে ৬০ দিন সকাল বিকেল পেট ভরে খাওয়ায়ে দেয়, বা একই জনকে ৬০দিন ৬০ বার ১সের সাড়ে বার ছটাক করে গম বা তার মূল্যের ধান, চাল বা পয়সা দিয়ে দেয়, তাতেও কাফফারা আদায় হয়ে যাবে।
  • যদি ৬০ দিন পর্যন্ত খাওয়ানোর বা মূল্য দেয়ার সময় মাঝখানে ২/১ দিন বাকী পড়ে, তবে তাতে কোন ক্ষতি নেই। লাগাতার ৬০ দিন না  হলেও সর্বশুদ্ধ ৬০ দিন খাওয়ানো হলে বা মূল্য দেয়া হলে তাতেই চলবে।
  • যদি ৬০ দিনের ফিদিয়া বা তার মূল্য হিসাব করে একই দিন একজন মিসকীনকে দিয়ে দেয়, তবে তাতে সম্পূর্ণ কাফফারা আদায় হবে না। মাত্র একদিনের কাফফারা আদায় হবে। বাকী ৫৯ দিনের কাফফারা পুনরায় আদায় করতে হবে। এরূপে যদি একদিন একজন মিসকীনকে ৬০ বার করে দেয়, তবুও মাত্র একদিনেরই কাফফারা আদায় হবে। বাকী ৫৯ দিনের  পুনরায় আদায় করতে হবে।

সারকথা এই যে, একদিন একজন গরীবকে একটি রোযার বেশি ফিদিয়া দিলে তা হিসাবে ধরা যাবে না। মাত্র একদিনের ফিদিয়া ধরা যাবে।

  • একজন মিসকীনকে পূর্ণ একটি ফিদিয়ার কম দিলে ফিদিয়া আদায় হবে না।
  • যদি একই রমযানের কয়েকটি রোযা ভেঙে থাকে, তবে একটি কাফফারাই সব কয়টি রোযার জন্য যথেষ্ট হবে। কিন্তু যে কয়টি রোযা ভেঙেছে সে ক’টির কাযা করতেই হবে।

সাহরী ও ইফতার

সাহরী ও ইফতার

সাহরী ও ইফতার :

  • সাহরী খাওয়া সুন্নাত ও সাওয়াবের কাজ। যদি না ক্ষুধা লাগে এবং তজ্জন্য খেতে না চায় তবুও অন্তত দু’তিন দানা শুকনা খেজুর (সুহারা) অথবা অন্য যা জুটে কমবেশি  কিছু খেয়ে নেবে। কিছু না হোক অল্প পানি পান করে নেবে।
  • কেউ  সাহরী না খেয়ে ‍যদি রাতে ওঠে এক-আধ পান খেয়ে নেয়, এতেও সাহরী খাওয়ার   সাওয়াব পাবে।
  • শেষ রাতে যথা সম্ভব দেরি করে সাহরী খাওয়া বেহতর (উত্তম)। তাই বলে এত দেরি করা ভাল নয়, যে প্রভাত হবার উপক্রম হয়ে রোযা না হওয়ার সন্দেহজনক হয়ে পড়ে।
  • যদি কেউ সাহরী শিগগির শিগগির  খেয়ে অর্থাৎ রাত শেষ হওয়ার অনেক আগে খেয়ে ফেলে এবং পরে পান, তামাক, চা, পানি ই্ত্যাদি অনেকক্ষণ পর্যন্ত খেতে থাকে এবং রাত প্রভাত হওয়ার অল্পক্ষণ পূর্বে কুলি করে নেয় তবুও দেরিতে সাহরী খাওয়ার সাওয়াব পেয়ে যাবে। এভাবে দেরি করা এবং দেরি করে খাওয়া এক সমান।
  • যদি রাতে সাহরীর সময় ঘুম না ভাঙে ঘটনাচক্রে বাড়ির সকলেই ঘুমের ঘোরে অচেতন থেকে যায়, তবুও সাহস করে না খেয়ে রোযা রেখে নেবে। সাহরী খেতে পারেনি বলে রোযা ছেড়ে দেয়া কাপুরুষতা ও ভারি গুনাহ।
  • যতক্ষণ পর্যন্ত ফজরের সময় না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সাহরী খাওয়া দুরুস্ত আছে, এর পর দুরুস্ত নয়।
  • ঘুম ভাঙতে অনেক দেরি হয়ে গেল, কিন্তু রাতের আন্দায না পেয়ে মনে করল এখনও রাত বাকী আছে, এজন্য সাহরী খেয়ে ফেলল। কিন্তু পরে সঠিক জানতে পারল যে, রাত প্রভাত হওয়ার পরে খাওয়া হয়েছে। এমতাবস্থায় এ রোযা শুদ্ধ হয়নি। এর কাযা করতে হবে, কাফফারা ওয়াজিব নয়। তবে সারাদিন রোযাদারের মত কাটাতে হবে, কিছু খাবে না। ঠিক এভাবে সূর্যাস্ত হয়ে গেছে ভেবে ইফতার করে নিলো এবং পরে সূর্য দেখা দিল এ রোযা ভঙ্গ হয়ে গেছে। এর কাযা করতে হবে, কাফফারা ওয়াজিব নয়। অধিকন্তু পরে সূর্যা্স্ত পর্যন্ত যে কয় মিনিট বাকী আছে ততক্ষণ আর কিছু পান বা আহার করা দুরুস্ত নয়।
  • সাহরী এত দেরিতে খেল যে,  ‍সুবহে সাদিক অর্থাৎ রাত প্রভাত হবার সন্দেহ দেখা দিল,তবে এখন আর কিছু খাওয়া-দাওয়া করা মাকরূহ। এরূপ সময়ে কিছু খাওয়া-দাওয়া করা খুবই অন্যায় এবং গুনাহ। অধিকন্তু পরে যদি সঠিকভাবে জানতে পায় যে, সাহরী খাওয়ার সময় রাত প্রভাত হয়ে গিয়েছিল তবে এ রোযার কাযা রাখতে হবে। আর যদি সঠিক জ্ঞান না হয়, শুধু সন্দেহ থেকে যায় তবে কাযা রাখা ওয়াজিব নয়। অবশ্য সাবধানতার খাতিরে কাযা রেখে নেয়া ভাল।
  • যখন নিশ্চিতভাবে সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়, তখন ত্বরিত রোযা খুলে নেয়া মুস্তাহাব। সূর্যাস্তের পরে ইফতার করতে অনর্থক দেরি করা মাকরূহ।
  • মেঘ-বৃষ্টির দিনে একটু দেরি করে ইফতার করবে যখন সূর্য ডুবেছে বলে  নিশ্চিত হবে তখন ইফতার করবে। শুধু ঘড়িঘন্টা ইত্যাদির ওপর ভরসা করবে না বরং নিজের অন্তরের গাওয়াহী ও সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে ইফতার করবে। কেননা, ঘড়িঘন্টা নির্ভুল নাও হতে পারে। এমনকি যদি কেউ তখন আযানও দিয়ে দেয় কিন্তু সঠিক সময় হতে এখনও সন্দেহ থাকে তবে রোযা খুলে নেয়া দুরুস্ত নয়।
  • শুকনা খেজুর (খোরমা) অথবা তা না পেলে কোন মিষ্টি দ্রব্য দ্বারা রোযা খোলা বেহতর (উত্তম) তাও যদি না হয়, তবে শুধু পানি দ্বারা ইফতার করে নেবে। কেউ কেউ নিমক দিয়ে ইফতার করা সাওয়াবের কাজ মনে করেন, এটা ভুল আকীদা।
  • সূর্যাস্ত হল কি না, এতে যতক্ষণ সন্দেহ থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত রোযা ইফতার করা জায়েয নয়।

রোযা ভঙ্গ হওয়া বা না হওয়ার কারণ এবং কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হওয়ার বিবরণ

রোযা ভঙ্গ হওয়া বা না হওয়ার কারণ এবং কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হওয়ার বিবরণ :

  • যদি কোন রোযাদার ভুলবশত পানাহার করে নেয় অথবা স্ত্রী সহবাস করে ফেলে তবে এতে রোযা নষ্ট হবে না। এমনিভাবে কয়েকবার খেলেও রোযা নষ্ট হবে না।
  • রোযার মধ্যে কাউকে খেতে দেখলে যদি ওই ব্যক্তি বলবান হয় এবং মনে হয় যে, রোযা রাখলে অস্বাভাবিক কোন কষ্ট হবে না, তবে তাকে রোযা স্মরণ করে দেয়া ওয়াজিব। আর যদি দুর্বল হয় রোযা রাখলে খুব কষ্ট হবে বলে মনে হয় তবে স্মরণ করাবে না, বরং খেতে দিবে। (আল্লাহই তাকে খাওয়াচ্ছে। আল হাদীস)
  • দিনের বেলা স্বপ্নদোষ হয়ে গোসলের হাজত হলে ও রোযা নষ্ট হবে না।
  • দিনের বেলা চোখে সুরমা লাগানো, গায়ে তেল মর্দন করা, আতর বা কোন সুগন্ধির ঘ্রাণ নেয়া যে কোন সময় দুরুস্ত আছে। এতে রোযার কোন ক্ষতি হবে না। বরং সুরমা লাগানোর পর যদি থুৃথুর সাথে অথবা নাকের শ্লেষ্মার সাথে সুরমার রঙ দেখা যায় তবুও রোযা নষ্ট হবে না, বা মাকরূহও হবে না।
  • গলার ভিতরে মশা বা মাছি, ধোঁয়া, ধুলা-বালি নিজে নিজে ঢুকে পড়লে রোযা ভঙ্গ হবে না। অবশ্য ইচ্ছা করে ঢুকালে ভঙ্গ হবে।
  • লোবান, আগরবাতি ইত্যাদি নিকটে জ্বালিয়ে নাকে তার সুগন্ধি ধোঁয়া নিলে রোযা ভঙ্গ হবে। এভাবে হুক্কা, বিড়ি, সিগারেট ইত্যাদি পান করলেও রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। অবশ্য এসব ধোঁয়া বাদে আতর, কেওড়া, গোলাপ ফুল ইত্যাদি বা কোন সুগন্ধি যার মধ্যে ধোঁয়া নেই, এসবের ঘ্রাণ নেওয়া দুরুস্ত আছে।
  • দাতের ফাঁকে গোশতের অংশ বা সুপারির কণা ছিল তা খিলাল দিয়ে বের করে গিলে ফেলল। কিন্তু মুখের বাইরে বের হয়নি বরং মুখের ভেতর হতে গলার ভেতরে চলে গেছে, তখন লক্ষ্য করে দেখ তা পরিমাণে কতখানি হবে? যদি তা চনা (বুট) পারিমাণ হতে কম হয় তবে রোযা নষ্ট হয়নি। আর যদি চনা পরিমাণ বা তা হতে অধিক হয় তবে নষ্ট হয়ে যাবে। হ্যাঁ, খিলাল করার পরে যদি মুখ হতে বের হয়ে আসার পর গিলে থাকে তবে চনা পরিমাণ হোক বা কম হোক উভয় অবস্থায় রোযা ভেঙ্গে যাবে।
  • থুথু যে পরিমাণ হোক না কেন তা গিলে ফেললে রোযা নষ্ট হয় না।
  • পান খেয়ে উত্তমরূপে কুলি গড়গড়া করে মুখ পরিষ্কার করেছে কিন্তু থুথু লাল রয়ে গেল, এতে রোযার ক্ষতি হবে না।
  • রাতে গোসলের হাজত হয়েছিল, কিন্তু রাতে গোসল করেনি, দিনের বেলা গোসল করল, তবুও রোযা হয়ে যাবে। বরং যদি সারাদিনের মধ্যেও গোসল না করে থাকে তবুও রোযা হয়ে যাবে। তবে অকারণে এরূপ দেরি করায় গুনাহগার হবে।
  • নাকের শ্লেষ্মা নাক দ্বারা জোরে টেনে নিলে পরে তা যদি গলার ভেতরেও চলে যায়, তবুও রোযা ভঙ্গ হবে না।
  • সাহরী খেয়ে পান চিবাতে চিবাতে ঘুমিয়ে পড়ে এবং রাত প্রভাত হল, পরে ঘুম ভেঙ্গে গেল, এ অবস্থায়  রোযা নষ্ট হয়ে গেছে। কাযা করবে, কাফফারা ওয়াজিব হবে না।
  • কুলি করার হময় হঠাৎ পানি গালার ভেতরে চলে গেল এবং রোযার কথা স্মরণ ছিল, এরূপ অবস্থায়ও রোযা নষ্ট হেয় গেছে। কাযা করবে, কাফফারা ওয়াজিব হবে না।
  • আপনা আপনি বমি হয়ে গেলে, বমি অল্প হোক বা বেশি হোক এতে রোযা নষ্ট হবে না। অবশ্য ইচ্ছা করে বমি করলে– যেমন : আঙ্গুল মুখে পুরে বমি করলে, তাহলে যদি মুখ ভরে বমি হয় তবে রোযা নষ্ট হবে। এর কম হলে নষ্ট হবে না।
  • অল্প বমি এসে আবার নিজে নিজে গলার ভিতরে ফিরে গেলে, এতে রোযা নষ্ট হবে না। অবশ্য ইচ্ছকৃতভাবে গলার দিকে ফিরিয়ে দিলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে।
  • কেউ যদি কনকর বা লোহার টুকরা ইত্যদি এমন কোন বস্তু খেয়ে ফেলে যা খাদ্যরূপে বা ওষুধরূপে ব্যবহার করা হয় না, তার রোযা ভেঙ্গে যাবে। কিন্তু কাফফারা ওয়াজিব হবে না। আর যদি এমন কোন বস্তু খায় বা পান করে যা লোকে সাধারণত খাদ্য অথবা পানীয়রূপে ব্যবহার  করে থাকে অথবা সাধরণ খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য না হলেও প্রয়োজন হলে তা ওষুধরূপে সেবন করা হয় তাহলে রোযা নষ্ট হবে। উপরন্তু কাযা ও কাফফারা দু’টিই ওয়াজিব হবে।
  • ইচ্ছাকৃতভাবে (অর্থাৎ রোযা স্বরণ থাকা অবস্থায়) স্ত্রীসম্ভোগ করলে উভয়ের রোযা নষ্ট হবে এবং কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হবে। পুরুষের লিঙ্গাগ্রভাগ যদি যোনীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তাতেই রোযা নষ্ট হেয় যাবে এবং উভয়ের প্রতি কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হবে। এ দু’অবস্থায় বীর্য বের হওয়াও শর্ত নয়।
  • যদি কোন হতভাগা তার পুরুষাঙ্গ স্ত্রীর মলদ্বারে প্রবেশ করে, তবে লিঙ্গগ্রভাগ প্রবেশ করলেই বীর্যপাত হোক বা না হোক উভয়ের রোযা নষ্ট হয়ে যাবে এবং  কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হবে।
  • রোযা ভঙ্গ করলে পরে কাফফারা শুধু ওই সময় ওয়াজিব হয়ে থাকে, যখন তা পবিত্র রমযান মাসের রোযা হয় (এবং রোযার নিয়তও থাকে এবং স্মরণ না থাকলে অথবা জোর-জবরদস্তিমূলকভাবে অনিচ্ছায় তা ভেঙ্গে ফেলতে বাধ্য হলে)  রমযান শরীফের রোযা ব্যতীত অন্য কোন রোযা ভঙ্গকরলে তা যে কোন প্রকারে ভঙ্গ করুক না কেন। এমনকি রমযানের কাযা রোযা রেখে ভঙ্গ করলেও এতে কাফফারা ওয়াজিব হবে না। যদি রাতে  রোযা রাখার নিয়ত না করে অথবা নিয়ত করে ভাঙ্গার  পরে (এমন কোন ব্যধি দেখা দিল যা হলে পরে রোযা ভেঙ্গে ফেলা দুরুস্ত আছে অথবা) যদি হায়েয আরম্ভ হয়ে যায়, তবে এ রোযা ভাঙার দরুণ কাফফারা ওয়াজিব হবে না।
  • রোযা রেখে কেউ নাকে নস্য টানলে অথবা তেল ঢাললে অথবা পায়খানার জন্য পানীয় ওষুধ ব্যবহার না করে শুধু ডুস করলেও রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু  কাযা ওয়াজিব কাফফারা ওয়াজিব হবে না। আর কানে পানি ঢাললে রোযা ভঙ্গ হবে না।
  • কোন মহিলা যদি রোযা রেখে প্রসবের গুপ্তাঙ্গে ওষুধ রাখলে অথবা তেল ইত্যাদি ঢাললে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। কাযা ওয়াজিব হবে, কাফফারা ওয়াজিব নয়।
  • ধাত্রী  কোন প্রয়োজনে প্রস্রাবদ্বারের মধ্যে আঙ্গুল ঢুকালে অথবা প্রসূতি নিজেই নিজের আঙ্গুল ঢুকালে অতঃপর পূর্ণ আঙ্গুল অথবা তার একাংশ বের করে পুনরায়  ঢুকালো, এতে রোযা নষ্ট হেয়ে যাবে কিন্তু কাফফারা ওয়াজিব নয়। আর  যদি আঙ্গুল একবার বের করার পর পর পুনরায় না ঢুকায় তবে রোযা ভঙ্গ হবে না।  হ্যাঁ, যদি পানি ইত্যাদি তরল কোন বস্তু দ্বারা আঙ্গুল পূর্ব হতে ভিজা থাকে তাহলে প্রথমবারেই রোযা নষ্ট হয়ে যাবে।
  • দাঁতে  রক্ত বের হতে ছিল, সে তা মুখের লালার সাথে গিলে ফেলল, এতে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। অবশ্য রক্ত যদি পরিমাণে লালার চেয়ে কম হয় এবং রক্তের স্বাদ মুখের ভিতরে মালুম না হয় তবে রোযা নষ্ট হবে না।
  • যদি জিহ্বা দ্বারা কোন কিছুর একটু স্বাদ নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে থুথু ফেলে দেয় তবে রোযা নষ্ট হয়নি। কিন্তু বিনা প্রয়োজনে এরূপ করা মাকরূহ। হ্যাঁ, ‍যদি কোন স্ত্রীলোকের স্বামী এতবড় পাজি ও স্বভাবগ্রস্ত হয় যে, তরকারির মাধ্যে লবণ পানি একটু কমবেশি হলে স্ত্রীর আর রক্ষা নেই। মারপিট ও অত্যাচার  করে থাকে তবে তরকারির লবণ জিহ্বায় পরিক্ষা করে থুথু ফেলে দেয়া দুরুস্ত আছে, মাকরূহ হবে না।
  • মা তার কচি শিশুকে রোযার দিনে নিজের ‍মুখে কিছু চিবায়ে খাওয়ানো মাকরূহ। অবশ্য অন্যরূপ ব্যবস্থা করতে না পারলে শিশুর প্রাণ বাচানোর প্রয়োজনে এরূপ চিবায়ে দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে ফেলা দুরূস্ত আছে, মাকরূহ নয়।
  • রোযার অবস্থায় কয়লা চিবায়ে অথবা মাজন দিয়ে দাঁত মাজা মাকরূহ আর যদি দাঁত মাজারকালে এর একটু অংশ গলার ভিতরে চলে যায় তবে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। আর শুকনা বা তাজা সব রকমের মিসওয়াক দ্বারা দাঁত পরিষ্কার করা দুরস্ত আছে। এমনকি এখনই কোন নিমের ডাল ভেঙে এনে যদি মিসওয়াক করা হয় এবং তার তিক্ততা মুখে অনুভবও হয় তথাপি মাকরূহ হবে না।
  • যদি সুরমা লাগিয়ে বা তেল মালিশ করে বা সিঙ্গা লাগিয়ে  অজ্ঞতাবশত মনে করে তার রোযা ভেঙে গেছে এবং পরে ইচ্ছা করে পানাহার করে ফেলে তবে কাযা ও কাফফারা দু’টিই ওয়াজিব হবে।
  • রমযান শরীফে যদি কোন কারণে হঠাৎ কারও রোযা ভেঙে যায়, তবে যদিও পরে কাযা করা ওয়জিব তথাপি রোযা ভেঙে যাওয়ার পরেও সারাদিন রোযাদরের মত থাকা ওয়াজিব।
  • কেউ যদি পবিত্র রমযান মাসে দুর্ভাগ্যবশত রোযর নিয়ত না করে এবং এজন্য পানাহর করতে থাকে, তবে শুধু কাযাই ওয়াজিব হবে, কাফফারা ওয়াজিব হবে না। নিয়ত করে রোযা ভাঙলেই শুধু কাফফারা ওয়াজিব হয়ে থাকে।
  • যদি কেউ ভুলক্রমে অর্থাৎ রোযা রাখার কথা স্মরণ না থাকার কারণে কিছু পানাহার করে ফেলে অথবা স্ত্রী সঙ্গম করে এবং স্মরণ হবার পরে মনে করে যে, তার রোযা নষ্ট হয়ে গেছে এবং এটা মনে করে এবার ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু পানাহার ( বা স্ত্রী সঙ্গম করে নেয় তবে এমতাবস্থায় মাসয়ালা জানা লোক না হলেও) রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। শুধু কাযা ওয়াজিব হবে কাফফারা দিতে হবে না। আর যদি মাসয়ালা জ্ঞাত হয় এবং ভুল বশত ওই রকম করার পরে ইচ্ছাকৃতভাবে রোযার ইফতার করে তবে স্তী সহবাসের ক্ষেত্রে কাযা ও কাফফারা দু’টিই ওয়াজিব হবে এবং পানাহারের ক্ষেত্রে কাফফারা নয়, তথনও কাযাই ওয়াজিব হবে।
  • আপনা আপনি বমি হয়ে গেলে অথবা দিনে স্বপ্নদোষ হয়ে গেলে অথবা কোন মেয়েলোক ইত্যাদি দেখে বীর্যপাত হয়ে গেলে এবং মাসয়ালা জ্ঞাত না থাকার দরুণ সে মনে করল যে, রোযা টুটিয়া গিয়েছে। এজন্য পরে ইচ্ছা করে খাওয়-দাওয়া করে ফেলল এতে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে এবং কাযা ওয়াজিব হবে কাফফারা ওয়াজিব হবে না। অবশ্য যদি মাসয়ালা জানা থাকে যে, এতে রোযা নষ্ট হয়নি এবং এতদসত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়া-দাওয়া করে বসে তাহলে কাফফারা ওয়াজিব হবে।
  • কোন পুরুষ যদি তার গুপ্তাঙ্গের ছিদ্রে ওষুধ বা অন্য কিছু ধারণ করে তবে যেহেতু এটা উদবস্থ হয় না, এ জন্য ইহা দ্বারা রোযা নষ্ট হবে না। কেউ যদি কোন মুর্দা স্ত্রীলোককের সাথে অথবা এমন স্বল্প বয়স্ক কোন মেয়ের সাথে সঙ্গম করে যার সাথে সাধারণত সঙ্গমের স্পৃহা হয়নি। অথবা যদি জীব-জন্তুর  সাথে এরূপ কুকর্ম করে অথবা যদি কাউকে আলিঙ্গন বা  চুম্বন করে অথবা যদি হস্ত মৈথুন করে এবং এসব অবস্থায় বীর্যপাত হয় তবে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। কাযা ওয়াজিব হবে, কাফফারা ওয়াজিব হবে না।
  • কোন রেযাদার মেয়েলোকের সাথে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদি কেউ জোর জবরদস্তি করে অথবা তার উম্মাদ অবস্থায় সঙ্গম করে তবে ওই মেয়েটির রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং কাযা ওয়াজিব হবে কাফফারা ওয়াজিব হবে না এবং রোযাদার হলে পুরুষের ওপর কাযা কাফফারা দু’টিই ওয়াজিব হবে।
  • ওই ব্যক্তি যার মধ্যে রোযা ওয়াজিব হওয়ার বস ক’টি শর্ত বিদ্যমান রয়েছে, সে যদি রাত হতে রমযান শরীফের রোযার নিয়ত করে এবং রেযার মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখে খেয়ে এমন কিছু  উদরস্থ করে যা সাধারণত মানুষ খাদ্য, ওষুধ বা পথ্য হিসাবে ব্যবহার করে থাকে অর্থাৎ এরূপ দ্রব্য ব্যবহার দ্বারা শারীরিক বা মানসিক কোন উপকার হতে পারে এবং এটা ব্যবহার করতে সুস্থ মস্তিষ্ক লোক ঘৃণা বোধ না করে তা যতই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র এমনকি তিল পরিমাণ হোক না কেন, কিংবা সে যদি সহবাস করে বা করায় (পুং মৈথুন ইত্যাদি সম্পর্কেও ওই একই বিধান) এবং সঙ্গম কালে গুপ্তাঙ্গের অগ্রভাগ মাত্র ভেতরে প্রবেশ করে এমনকি বীর্যপাত নাও হয়ে  তাহলে ওই সকল অবস্থায় কাযা ও কাফফারা দু’টিই ওয়াজিব হবে। অবশ্য ওই মেয়েলোক যার সাথে সহবাস করেছে সে যদি সঙ্গমের উপযুক্ত হয়, ছোট বালিকা মাত্র না হয়।
  • কেউ যদি মাথায় তেল মালিশ করে অথবা চোখে সুরমা লাগায় অথবা কোন পুরুষ যদি তার লিঙ্গের ছিদ্রের মধ্যে কোন শুষ্ক দ্রব্য এমনভাবে ঢুকায় যে তার মাথা বাইরে থাকে অথবা কোন ভিজা জিনিস রাখে এবং তা খাৎনার স্থান পর্যন্ত না পৌছায়ে থাকে তবে যেহেতু এ সকল বস্তু পেটের ভিতরে পৌছে না এ জন্য রোযা নষ্ট হবে না এবং কাযা বা কাফফারা কোনটিই ওয়াজিব হবে না।  আর যদি রুই, তুলা কাপড় ইত্যাদি কোন শুকনা জিনিস কোন পুরুষ তার মলদ্বার দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করায় এবং তা সম্পূর্ণ ভেতরে চলে যায় অথবা যদি কোন ভিজা জিনিস ডুস ব্যবহারের স্থান পর্যন্ত মলদ্বার দিয়ে ঢুকিয়ে দেয় তবে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে এবং শুধু কাযা ওয়াজিব হবে।
  • যে সকল লোক হুক্কা পান করতে অভ্যস্ত তারা যদি রোযার দিনে বিশেষ কোন উপকারের জন্য ও হুক্কা পান করে (অথবা বিড়ি সিগারেট ইত্যাদি ধূমপান করে) তবে কাযা ও কাফফারা দু’টিই ওয়াজিব হবে।
  • যদি কোন স্ত্রীলোক কোন না-বালেগ ছেলে দ্বারা অথবা কোন পাগল, উম্মাদগ্রস্ত লোক দ্বারা সঙ্গম করায় হবে তার উপর কাযা ও কাফফারা দু’টিই ওয়াজিব হবে।
  • সঙ্গমের বেলায় নারী ও পুরুষ উভয়ে ‘আকেল’ বা হুশ-জ্ঞান বিশিষ্ট হওয়া শর্ত নয়। অতএব, একজন জ্ঞান বিশিষ্ট এবং অপর জন পাগল হলেও জ্ঞান বিশিষ্ট জনের উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে।
  • স্বপ্নে বীর্যপাত হয়ে গেলো যাকে ইহতেলাম বা স্বপ্নদোষ বলা হয়, যদি গোসল না করে কেউ রোযা রেখে নেয় তবে এতে রোযা নষ্ট হবে না। অনুরূপভাবে কোন মেয়েলোক বা তার গুপ্তাঙ্গ দর্শন করলে অথবা ধ্যান বা কল্পনা করলে বীর্য বাইর হয়ে পড়ে তাহলেও রোযা নেষ্ট হবে না।
  • কোন পুরুষ যদি তার লিঙ্গের ছিদ্র পথে তেল, পানি বা কাঠি ইত্যাদি পিসকারী যোগে বা অন্য কোন প্রকারে ঢুকায়ে ফেলে তবে তা এমনকি মুত্রকোষ পর্যন্ত পৌছে গেলেও রোযা নষ্ট হবে না।
  • রোযার কথা স্মরণ ছিল না এ অবস্থায় অথবা রাত কিছুটা বাকী ছিল এমন সময় কেউ স্ত্রী সঙ্গম আরম্ভ করল বা কিছু পানাহার করতে শুরু করল, কিন্তু রোযার কথা স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে অথবা সুবহে সাদিক হতে না হতেই স্ত্রীসঙ্গম ছেড়ে দিল বা মুখের গ্রাস ফেলে দিল তাহলে রোযা নষ্ট হবে না। এমনকি সঙ্গম ছেড়ে দেয়ার পরে যদি বীর্যপাতও হয়ে পড়ে তবুও রোযার ক্ষতি হবে না এবং এ বীর্যপাত ইহতেলাম বা স্বপ্নদোষের পর্যায় ভুক্ত বলে গণ্য হবে।
  • দ্বিপ্রহরের পরে বা দিনের বেলা যে কোন সময়ে মিওয়াক করলে এবং তাজা বা গুকনা যে কোন রূপ মিসওয়াক ব্যবহার করলেও রোযার কোন ক্ষতি হবে না।
  • স্ত্রীকে চুমা বা আলিঙ্গন করলে যদি বীর্যপাত হওয়ার অথবা উত্তেজনা সৃষ্টির এবং উত্তেজনাবশে সম্ভোগের আশঙ্কা দেখা দেয় তাহলে চুমা বা আলিঙ্গন করা মাকরূহ হবে। এরূপ আশঙ্কা না হলে মাকরূহ হবে না।
  • কোন মেয়েলোকের ঠোট মুখে পুরে নেয়া এবং লিঙ্গ দ্বারা বিনা কোন আবরণে যোনী শুধু স্পর্শ করাও সর্বাবস্থায় মাকরূহ। বীর্যস্থলন বা সম্ভোগের আশঙ্কা হোক বা না হোক।
  • যদি কোন ব্যক্তি মুকীম (বাড়িতে অবস্থানরত) থাকা অবস্থায় রোযার নিয়ত করার পর সফরে বাইর হয় এবং কিছু দুর যেতে ভুলে ফেলে যাওয়া কোন জিনিস নেয়ার জন্য পুনরায় বাড়িতে ফিরে আসে এবং বাড়ি পৌছে রোযা ভেঙে ফেলে তবে কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হবে। যদিও বাড়িতে দেরি করার ইচ্ছা না থাকে বা দেরি না করে। কেননা, রোযা ভাঙার সময় যে মুসাফির ছিল না বরং অল্পক্ষণের জন্য হলেও তখন সে স্বগৃহে অবস্থান করতে ছিল এবং মুকীম ছিল।
  • স্ত্রী সহবাস ব্যতীত অন্য কোন কারণে যদি কাফফারা ওয়াজিব হয়ে থাকে এবং এক কাফফারা সমাধান না করতে দ্বিতীয়বার কাফফারা ওয়াজিব হয়ে থাকে তবে একই কাফফারা যথেষ্ট হবে। এমনকি এ ‍দু’কাফফারা একাধিক রমযানে ওয়াজিব হলেও একই কাফফারা দিলে চলবে। হ্যাঁ! সহবাসের কারণে যে সকল রোযা নষ্ট হয়েছে তা যদি একই রমযানের ভিতরে হয়ে থাকে তবে একই কাফফারা যথেষ্ট হবে এবং আকাধিক রমযানের বেলায় প্রত্যেক রমযানের কাফফারা ভিন্ন ভিন্ন দিতে হবে। প্রথম কাফফারা আদায় হয়ে থাকুক বা না থাকুক। (এটা কাফফারাসমূহের অন্তঃ যু্ক্তি বা বিযুক্তি সম্পর্কিত মোট তিনটি অভিমতের একটি। বিশদ বিবরণ মূল বেহেশতী গাওহার ১০১ পৃষ্ঠায় দেখতে পারেন।)